আমাদের দর্শকেরা জেনে গিয়েছেন যে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন ভারত সফরে এসেছিলেন বৃহস্পতিবা। সফর ছিল দু’দিনের। রুশ প্রেসিডেন্টের সফরে দিকে কার বা কোন দেশের বেশি নজর ছিল, তা হয়তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না। নজর ছিল আমেরিকা এবং তাদের মি. ডনের। এই ডন সাহেব ভারতকে ল্যাজে খেলাতে চেয়েছিলেন। তিনি চড়া হারে শুল্ক আরোপ করেন। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির বিষয়টি তিনি ঝুলিয়ে রেখেছেন। ভারত চুপচাপ সহ্য করে গিয়েছে। খোঁজ করতে শুরু করে বিকল্প রাস্তার। সেই রাস্তা সাউথব্লক পেয়ে গিয়েছে। সাউথব্লক ডনকে এখন উল্টে ল্যাজে খেলাচ্ছে। দিল্লি সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা রাশিয়া থেকে তেল কিনবে। দিল্লির সিদ্ধান্তে যারপরনাই খুশি মস্কো। তারা ব্যারেল পিছু তেলের দাম কমিয়ে দিয়েছে। দিল্লিতে এসে রুশ প্রেসিডেন্ট যা করলেন, তাতে ডন আরও চাপে পড়ে যাবেন, তা বলাই বাহুল্য। প্রধানমন্ত্রী মোদি এবং রুশ প্রেসিডেন্টের উপস্থিতিতে দিল্লির সঙ্গে মস্কোর ১৬টি বিষয়ে চুক্তি হয়েছে। আমাদের দর্শকদের কাছে তুলে দরব সেই সব চুক্তির বিষয়।
বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী
দিল্লি-মস্কো ঠিক করে ফেলেছে আগামী ছয় বছরের বাণিজ্যিক পথনকশা। ২০৩০-য়ের মধ্যে ১০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার বাণিজ্যের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। যৌথ সাংবাদিক বৈঠকের আগে থেকেই জানিয়েছিল ভারত সরকার – দুই দেশের আর্থিক সমন্বয়ের পথ আরও ঘনিষ্ঠ হবে। এই প্রসঙ্গে রুশ প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে ভারত-রাশিয়ার লেনদেন পৌঁছে গিয়েছে ৬৪ বিলিয়ন ডলার। শীঘ্রই এই অঙ্কটা পৌঁছে যাবে ১০০ বিলিয়ন ডলারে। ’
চেন্নাই-ভ্রাদিভোস্টক: সমুদ্রপথে নতুন যোগ
সফরের সব থেকে সর্বাধিক গুরুত্ব ঘোষণা – ইন্টারন্যাশনাল নর্থ সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডোরে নতুন গতি। চেন্নাই থেকে রুশ বন্দর ভ্রাদিভোস্টক পর্যন্ত সরাসরি সমুদ্রপথের রুপরেখা তৈরি। এতে ভারত – রাশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যে সময় ও খরচ দুটোই কমবে।
পারমাণবিক শক্তিতে বড়ো প্রতিশ্রুতি
পারমানবিক শক্তি সহযোগিতায় বড়ো অগ্রগতি। তামিলনাড়ুর পারমাণবিক কেন্দ্র সম্পূর্ণ করতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন পুতিন। পাশাপাশি ইসরো-রসকোসমস যৌথভাবে মহাকাশ গবেষণা, উপগ্রহ প্রযুক্তি ও ভবিষ্যতের অভিযানে সহযোগিতা বাড়বে বলে জানিয়েছেন দুই দেশের আধিকারিকেরা।
সন্ত্রাসদমনে দিল্লি-মস্কো এক বাক্য
এই ক্ষেত্রে মোদির বক্তব্য ছিল তীক্ষ্ণ ও সুস্পষ্ট। “ পহেলগাম থেকে ক্রোকাস সিটি হল ঘটনার উৎস এক।” বৈঠক শেষে দুই দেশ একযোগে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে।
বৃহস্পতিবার ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহের সঙ্গে বৈঠক করেন রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রে বেলুসোভ। সেখানেই প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে সম্মত হয়েছে ভারত এবং রাশিয়া। রাশিয়া থেকে আরও এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার বিষয়েও ইচ্ছাপ্রকাশ করেছে ভারত। ২০১৮ সালের অক্টোবরে রাশিয়ার থেকে পাঁচটি এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার জন্য চুক্তিতে সই করেছিল ভারত। আমেরিকার হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারের সেই চুক্তি হয়েছিল। ভারতীয় মুদ্রায় তার মূল্য আজকের দিনে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা। তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র ইতিমধ্যে হাতে পেয়েছে ভারত। সিঁদুর অভিযানে ওই এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সূত্রের খবর, ভারত রাশিয়ার থেকে এ বার এস-৫০০ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার বিষয়ে ভাবনাচিন্তা করছে। রাশিয়া থেকে কেনা সে সব ক্ষেপণাস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণের প্রযুক্তি তৈরি হবে ভারতেই।
দিল্লি এবং মস্কো শুক্রবার একটি যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, রাশিয়ায় তৈরি অস্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে প্রযুক্তি, স্পেয়ার পার্টসের প্রয়োজন, তা তৈরি হবে ভারতে। এই যৌথ উৎপাদনে উৎসাহ দিতে দুই দেশই সম্মত হয়েছে। প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রকল্পের অধীনে সেগুলি ভারতে তৈরি হবে। ভারতে তৈরি এই প্রযুক্তি তৃতীয় বন্ধুদেশ রফতানি করার বিষয়েও সম্মত হয়েছে দুই দেশ। আরও আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি তৈরির বিষয়ে দুই দেশ পরস্পরকে সহযোগিতা করবে বলেও বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।












Discussion about this post