একদিকে ভারত-রাশিয়ার বন্ধুত্বের সম্পর্ক আরও মজবুত হচ্ছে অন্যদিকে বিবাদ ভুলে চিন এখন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। ওদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ক্রমশ তলানির দিকে যাচ্ছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। এরমধ্যেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দু-দিনের ভারত সফর বিশ্বের প্রবল ক্ষমতাধর দেশের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। পশ্চিমা বিশ্ব, অর্থাৎ আমেরিকা ও ইউরোপীয় দেশগুলি বুঝে গিয়েছে, নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারত আর মাথা নত করবে না। ফলে বাধ্য হয়েই এবার তাঁদের পররাষ্ট্রনীতি পরিবর্তন করছে ওয়াশিংটন। পুতিনের ভারত সফরের মাঝেই নিজেদের পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক নথি প্রকাশ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তাতে বেশ কয়েকটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় রয়েছে। যেমন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজি বা জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে ভারতকে একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। তেমনই চিনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করে তাইওয়ানকে রক্ষা করার কথাও বলা হয়েছে। ২০২২ সালে প্রকাশিত এর পূর্ববর্তী ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজিতে বাইডেন প্রশাসন যে অগ্রাসী নীতি নিয়েছিল। এবারের ট্রাম্প প্রশাসন তার থেকে অনেকটাই সরে এসেছে। ট্রাম্প প্রশাসন এখন চিনের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে। তাইওয়ান দখল করা নিয়ে চিনকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। এমনকি বেজিংয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতাকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।
কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজিতে ভারতকে ইন্দো প্যাসিফিক অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবেই বলা হয়েছে। যা কূটনৈতিক মহলে যথেষ্টই চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। এই বিষয়টি বিশ্লেষণ করে কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা দাবি করছেন, এই সিদ্ধান্ত পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে যথেষ্টই চাপে ফলে দিল। ভারত-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর কূটনৈতিক গুরুত্ব দেওয়ার কথা উল্লেখ করে ওই নথিতে বলা হয়েছে, ‘আমাদের ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক এবং অন্যান্য সম্পর্ক উন্নত করতে হবে’। এই অন্যান্য সম্পর্ক নিয়েই এখন মূল চিন্তা পাকিস্তান বা বাংলাদেশের। যুক্তরাষ্ট্র যে ভারতকে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে চাপ দিয়ে আসছে এটা সকলেই জানে। কিন্তু ভারত এখনও বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্য করেনি। তবে আলোচনা চলছে দুই দেশের প্রতিনিধিদের। সেই কারণেই হোয়াইট হাউস গুরুত্বপূর্ণ নথিতে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার কথা বলেছে। তাঁরা অবশ্য এখানেই থেমে থাকেনি। ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামো হিসেবে দেখানো হয়েছে। ঠিক এই আবহেই কার্যত বোমা ফাটিয়েছেন পেন্টাগনের প্রাক্তন আধিকারিক মাইকেল রুবিন। একদা মার্কিন প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ এই কর্তা দাবি করেন, পাকিস্তানের চাটুকারিতাতেই মজে রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর জন্যই ভারত-আমেরিকার সম্পর্কে ফাটল ধরেছে। এক ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাঁর আরও দাবি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট যে বিপর্যয় ঘটিয়েছেন, তাতে আগামী কয়েক দশক ধরে আমেরিকাকে কৌশলগত ঘাটতির সম্মুখীন হতে হবে। তিনি পাকিস্তানের বন্ধু তুরস্ক ও কাতারের ঘুষ দেওয়ার প্রসঙ্গও টেনে এনেছেন ট্রাম্পকে কাঠগড়ায় তুলে। তবে সাম্প্রতিক প্রকাশিত ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজি প্রমান করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন। এবং তিনি পিছু হঠছেন। কেউ কেউ বলছেন, ট্রাম্প পিছু হঠেছেন দেশের মধ্যেই সৃষ্টি হওয়া অসন্তোষ দেখে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মার্কিন নীতি পরিবর্তন হওয়ায় ভারতের সুবিধা কি আর বাংলাদেশই বা কিভাবে বিপাকে পড়বে? উত্তরটা খুব সহজ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আগের মতোই দক্ষিণ এশিয়ায় চিনের প্রভাব মোকাবিলায় ভারতকেই অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দেবে। এতে ভারতের মতামতকে সম্মান দিতে চাইবে ওয়াশিংটন। পাকিস্তান ও বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ নিয়ে ভারতের বক্তব্যকে হয় সমর্থন দেবে, না হয় নিজেদের দূরত্ব বজায় রাখবে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে। এই অঞ্চলে এবার থেকে ভারত নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেবে আর তা কার্যত মেনে নেবে বা সংযত থাকবে ওয়াশিংটন। কিন্তু এর মধ্যেই যা জানা যাচ্ছে সেটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ওয়াশিংটন খুব শীঘ্রই একজন দূতকে বাংলাদাশে পাঠাচ্ছে। যিনি মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের একজন উচ্চপদস্থ আধিকারিক। সম্ভবত আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে সবদলের অংশগ্রহণের বিষয়ে বিশেষ পরামর্শ দিতেই তাঁকে পাঠাচ্ছে হোয়াইট হাউস। অর্থাৎ, আওয়ামী লীগের ব্যাপারে ভারতের যে চিন্তাধারা কিনবা বাংলাদেশে নিজেদের বন্ধু সরকার বসানো নিয়ে নয়া দিল্লির নীতি সেটা নিয়ে ইতিমধ্যেই দিল্লি ও ওয়াশিংটনের মধ্যে কয়েকদফা আলোচনা হয়ে গিয়েছে। এবার তার চূরান্ত রূপরেখা প্রস্তুত করতেই ঢাকায় আসবেন মার্কিন দূত। অর্থাৎ চাপ বাড়তে শুরু করেছে ইউনূস সরকারের উপর।
আবার বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছে ডিপ স্টেট। জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী পর্যায়ে হাসিনা সরকারের পতনের পর এসেছিল ডিপ স্টেটের...
Read more












Discussion about this post