২৩তম ভারত-রাশিয়া বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের জন্য রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিনের নয়াদিল্লি সফর কেবলমাত্র নিয়মতান্ত্রিক কূটনীতি ছিল না। এর গুরুত্ব আরও অনেক বিস্তৃত। বিশেষ করে এটি ছিল ভঙ্গুর বিশ্বে ধারাবাহিকতার একটি শক্তিশালী সংকেত। আবার তীব্র ভূ-রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে পুতিনের এই ভারত সফর ছিল মরুদ্যানের মতো। তবুও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে, ভ্লাদিমির পুতিনের এই জাঁকজমকপূর্ণ সফর থেকে ভারত কি পেল? সেরকম কোনও উল্লেখযোগ্য চুক্তি তো সামনে আসেনি? তাহলে এত প্রচার কেন? এই প্রশ্নগুলোই মূলত ঘোরাফেরা করছে বিভিন্ন মহলে।
কংগ্রেস নেতা শশী থারুর একটি প্রতিবেদন লিখেছেন ভারতের এক সংবাদমাধ্যমে। তিনি বিরোধী দলের সাংসদ, যে দল প্রথম থেকেই মোদি সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। কিন্তু কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুর দলের উল্টো পথে হেঁটে পুতিনের ভারত সফর নিয়ে উচ্ছসিত প্রশংসা করলেন। তিনি লিখলেন এই শীর্ষ সম্মেলনের ফলাফল বিস্তৃত ছিল: বাণিজ্য ও প্রযুক্তির জন্য একটি ভিশন ২০৩০ রোডম্যাপ। পাশাপাশি নতুন জ্বালানি ও পারমাণবিক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি, একটি যুগান্তকারী RELOS প্রতিরক্ষা সরবরাহ চুক্তি এবং শ্রম চলাচল, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক প্রশিক্ষণের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি। শশী থারুর লিখলেন, এই চুক্তিগুলি দৃশ্যত স্পষ্ট ছিল না তবে তর্কাতীতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। কূটনৈতিক মহল বলছে, যখন ওয়াশিংটন রাশিয়ার উপর ব্যাপক শুল্ক এবং নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল, তখন তাঁদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট ছিল। মস্কোকে বাকি বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করা, তাঁদের অর্থনীতিকে দুর্বল করা এবং পশ্চিমা দাবি মেনে নিতে বাধ্য করা। ঠিক পরিস্থিতিতে যখন বিশ্বের বাকি দেশগুলি রাশিয়া থেকে সরে আসছে, তখন ভারত আরও বেশি করে দীর্ঘদিনের বন্ধু রাশিয়ার পাশে দাঁড়িয়েছে। যাবতীয় নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক বোমা উপেক্ষা করে রাশিয়া থেকে তেল কিনেছে। এর অপ্রত্যাশিত পরিণতি মারাত্মক। মার্কিন শুল্ক কেবল রাশিয়ার জীবনরেখা বিচ্ছিন্ন করতে ব্যর্থ হয়নি, উঠলে ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত বিশ্বব্যাপী ভূ-রাজনীতিতে ভারতের প্রভাবকে আরও শক্তিশালী করেছে। এর সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়েছিল জ্বালানি খাতে। পশ্চিমা দেশগুলির কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে রাশিয়া, ফলে অতিরিক্ত ছাড় দিয়ে অপরিশোধিত তেল সরবরাহ শুরু করে ভারতকে। এতে যেমন রাশিয়ার তেল আমদানি বৃদ্ধি পায়, তেমনই ভারতকে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং সাশ্রয়ী মূল্যের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। এটি কেবল তেলের ব্যারেল সম্পর্কে নয়। এটি একটি গভীর কৌশলগত বিকল্প প্রতিফলিত করে। ফলে রাশিয়ার দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানো প্রকৃত বন্ধু ভারতকে যে প্রেসিডেন্ট পুতিন উজাড় করে দেবেন সেটা বলাই বাহুল্য।
নয়াদিল্লির সাম্প্রতিক বৈচিত্র্য এবং মেক ইন ইন্ডিয়া প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, মস্কো ভারতের সামরিক সরঞ্জামের প্রধান সরবরাহকারী হিসেবে রয়ে গেছে। নয়া দিল্লি এবার এটাই পাল্টাতে চাইছে। পুতিনের সাম্প্রতিক সফরে ভারত এটাই পাল্টে নিল। জানা যায়, আমাদের প্রতিরক্ষা রপ্তানির প্রায় ৪৫ শতাংশ এখনও রাশিয়া থেকে আসে। নতুন চুক্তি অনুযায়ী এবার এই সমস্ত প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে ভারতেই তৈরি হবে। ফলে একদিকে যেমন প্রতিরক্ষা খাতে আমদানি নির্ভরতা কমবে, তেমনই ভারতে নতুন বিনিয়োগ আসবে, কর্মসংস্থান বাড়বে, অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। যদিও কোনও নতুন বড় কৌশলগত অধিগ্রহণের ঘোষণা দেওয়া হয়নি, তবুও একটি সামরিক সরবরাহ-ভাগাভাগি চুক্তি, RELOS চুক্তি চূড়ান্তকরণ, অপারেশনাল সহযোগিতা আরও গভীর করবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে কয়েকটি বড় চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত হয়েছে পুতিন ও মোদির উপস্থিতিতে। তাঁদের দাবি, S-400 এয়ার ডিফেন্স ও তাঁর আরও আপগ্রেড সংস্করণ S-500 চুক্তি প্রায় সম্পন্ন। এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমরাস্ত্র এবার ভারত ও রাশিয়া যৌথভাবে তৈরী করবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিটি দুই দেশ কৌশলগত কারণে এখনও গোপন রেখেছে, সেটা হল SU-57 পঞ্চম প্রযুক্তির যুদ্ধবিমান চুক্তি। যা সম্ভাব্য মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে গোপন করা হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রথম থেকেই ভারতকে তাঁদের F-35 ফাইটার জেট বিক্রি করতে চায়, কিন্তু প্রযুক্তির হস্তান্তর করতে নারাজ। যা রাশিয়া দিতে রাজি। অর্থাৎ সামনে এক আর ভিতরে আরেক। এটাও এক বড় কূটনীতি।












Discussion about this post