দিনের আলোয় পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে পর পর গুলি।
আর ওই গুলি তাঁর মাইলেজ আরও বহুগুন বাড়িয়ে দিল। মিডিয়ার সব আলো সে একাই শুষে নিল। মানুষ ভুলে গেল ভোটের কথা। বলা ভালো পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে গুলি ভুলিয়ে দিল সব কিছু। মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে গেল তাঁর নাম। সুস্থ অবস্থায় তাঁর নাম-ডাক যে একেবারে শোনা যায়নি, এমনটা নয়। ‘জয়বাবা ফেলুনাথ’-য়ের মগনলাল মেগরাজের ভাষায় ‘নাম কিনো বলছেন? বদনাম বলুন, বদনাম।’
কারও কাছে সে নামি। কারও কাছে সে বদনামি, বদমেজাজি। মেদহীন শরীর। ঋজু গঠন। কথা বলার কায়দাটা এমন যে তাঁর দিকে একবারের জন্য তাকাতেই হবে। চোখ অদ্ভুত জাদু মাখানো। তাঁর গলার আওয়াজ যেমন পদ্মাপারে শোনা গিয়েছিল, পদ্মা পেড়িয়ে সেই আওয়াজ ভারত ভূখণ্ডেও ঢুকে পড়ে। কারণ, ওই আওয়াজ ছিল ভারত-বিরোধী। আর পদ্মার ওপারে তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল প্রতিবাদের। ‘হ্যাঁ’-কে ‘হ্যাঁ’ বলা আর ‘না’ – কে ‘না’ বলার মতো হিম্মত বুকে রাখত এই তরুণ তুর্কি নেতা। এই শিক্ষা তিনি পেয়েছেন তাঁর বাবার থেকে। পরিবারের তিন ভাই-বোনের মধ্যে সে সব থেকে ছোট। জন্ম ঝালোকাঠির নলসিটি উপজেলায় এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। হাতেখড়ি ঝালোকাঠির কাবিল মাদ্রাসায়। ছোটো থেকেই লেখাপড়ার পাশাপাশি চলত তাঁর কলম। ক্লাস সেভেন –এইটে থাকাকালীন সে জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল। আর সবক্ষেত্রে সে প্রথম। রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক। মাদ্রাসা থেকে সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাই, তাঁকে কম কটুকথা শুনতে হয়নি। অধ্যাপকদের থেকেও যেমন এসেছে, কটু মন্তব্য এসেছে সহপাঠীদের থেকেও। তবুও সে একবারের জন্য লক্ষ্যচ্যূত হয়নি।
কথা বলেন কঠোর ভাষায়। সোজা কথা সোজাভাবে বলতেই সে পছন্দ করে। তাই, বাংলাদেশের জেন-এক্সের কাছে এই তরুণ খুব কম সময়ে হয়ে উঠেছিল আইডল। সেলুলয়েডের রঙিন দুনিয়ায় যাঁদের চেনে, তাঁদের থেকে বেশি জনপ্রিয় এই তরুণ। গত জুলাই-অগাস্ট আন্দোলনের সুযোগ্য নেতৃত্ব দিয়েছিল এই ঝাঁকরা মাথার ঘন কুচকুচে কালো চুলের ছেলেটা। পোশাকে তেমন কোনও আড়ম্বর নেই। পাঞ্জাবি আর পায়জামাতেই স্বচ্ছন্দ। তা সে সাংবাদিক সম্মেলন হোক বা সভামঞ্চ বা টিভিতে সাক্ষাৎকার। এক গাল দাঁড়ি। অগোছালোভাবে বিন্যস্ত। দেখলে বোঝাই যায় দাড়ির প্রতি তাঁর একেবারেই যত্ন-আত্তি নেই। কিন্তু নিজের কথার কাছে সে অত্যন্ত যত্নশীল। নিজের প্রতি কতটা আত্মবিশ্বাস থাকতে পারে, সেটা এই তরুণকে দেখলে বোঝা যাবে। সে একাধারে একজন শিক্ষক, একজন সংগঠন, একজন সুলেখক। বহুবার তাঁর মা, বোন ও স্ত্রীকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়ারও হুমকি পেয়েছিল। কিন্তু কোনও হুমকি হাদির প্রতিবাদী কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে পারেনি।
কেমন তাঁর প্রতিবাদী কণ্ঠ। কিছুদিন আগে একটা সভামঞ্চ থেকে তাঁকে বলতে শোনা যায় – ‘জুলাইয়ের সঙ্গে যদি গদ্দারি করেন, তাহলে আমার বাপেও আমার বাপ না। আমার মা আমার মা না। আমার সন্তান আমার সন্তান না’
বেশ কিছুদিন আগে এই তরুণ বাংলাদেশের একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘এরকম একটা প্ল্যাটফর্ম হওয়া উচিত এই চিন্তা ৫ আগস্ট রাত থেকে। এর আগে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন কার্যক্রম করার চেষ্টা করেছিলাম। যেমন গত ঈদের রাতে আমরা ‘ঈদের মিছিল’ নামে একটা কালচারাল একটিভিটি করেছিলাম। এমনিতেই আমরা ভাবছিলাম কীভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে রিলেট করে কালচারাল অ্যাকটিভিটি করা যায়। কিন্তু ইনকিলাব মঞ্চ নাম নিয়ে করবো সেটা ৫ অগাস্ট মিছিল করে রাতে বাসায় ফিরবার পরে মনে হয়েছে। কারণ মনে হয়েছিল, সবাইকে কালচারাল কাজের মধ্য দিয়ে এক রাখতে হবে। যেটা বড় রাজনৈতিক দলগুলো করতে পারতো। বিএনপি পারতো। জামায়াত পারতো। শাহবাগ ১৫ দিন দখল করে রাখা। গান-বাজনা করা। মানুষকে একত্রে রাখা। বিপ্লবের পরে যেটা খুব জরুরি। কিন্তু তারা কেউ করেনি। তাই আমরা ইনকিলাব মঞ্চ করলাম। ’
তাই, যখন বাংলাদেশবাসী শুনল তাঁকে গুলি করা হয়েছে। গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি, তখন জনতার স্রোত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজমুখী। হাসপাতালের বাইরে খালি কালো মাথা। জনতার একটা প্রশ্ন – সে কেমন আছে? ভালো ছিল না। তাই, তাকে সিঙ্গাপুর নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আশা করা যায় আমাদের দর্শক বুঝতে পেরেছেন কার কথা বলা হচ্ছে। শরিফ ওসমান হাদি। সে কখনও কোনও ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল না। হাতে খড়ি মাদ্রাসায়। সেখান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়। হাদির চেহারা দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকেরা জোরের সঙ্গে বিশ্বাস করতেন, এই ছেলেটা কোনও না কোনও দলের সদস্য। কিন্তু কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাঁর সরাসরি ছিল না। তাই, কারও কাছে সে আওয়ামী-বিরোধী, কারও কাছে সে বিএনপি-বিরোধী। তাই, এবার গুলি করে কণ্ঠ স্তব্ধ করার একটা চেষ্টা হল। প্রশ্ন একটাই জুলাই আন্দোলনের নেতাদের, যাঁরা জনগণের মাঝে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সচেতনতা তৈরি করছেন, তাঁদের একে একে সরিয়ে দেওয়ার এক সুদূর প্রসারী মাস্টারপ্ল্যান চলছে। এটা কি কেবল নেতাদের নিঃস্তব্ধ করে দেওয়া ? না কি এর লক্ষ্য আরও গভীরে? পুরো আন্দোলনকে শিকড়সমেত উপড়ে ফেলা, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে আর কেউ মাথা তুলে দাঁড়ানোর সাহস না পায়।












Discussion about this post