রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটা হওয়ারই কথা ছিল। আজ না হলে কাল, অথবা পরশু। এটা হতই। কারণ, এই সমঝোতায় দলের অনেকের আপত্তি ছিল। দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা এই নির্বাচনী আঁতাত মেনে নিতে রাজি নয়। কেন নয়, তার যুক্তি হিসেবে উঠে আসে দলীয় আদর্শের কথা। অনেকে বলছে, যে আদর্শকে পাথেয় করে দলের পথ চলা শুরু হয়েছিল, দল আজ সেই আদর্শ থেকে সরে গিয়েছে। এমন একটি দলের সঙ্গে জোট গঠন করা হয়েছে, যে দলের লক্ষ্য হল দেশে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠা করা। দেশটাকে দ্বিতীয় তালিবান করার অভিপ্রায় নিয়ে দলটি এগিয়ে যেতে চাইছে। কিন্তু বাংলাদেশ বিশেষ কোনও ধর্মের দেশ নয়। এই দেশ সব ধর্মের মানুষের দেশ। সব বর্ণের মানুষের দেশ। সুতরাং, যে দলের আসল লক্ষ্যই হল দেশে ইসলামি শাসন কায়েম করা সে দলের সঙ্গে জোট গঠন করা মানে পদ্মায় আদর্শের অন্তর্ঞ্জলি যাত্রা। দলের একাংশের মতে, জোট করার বিষয়ে তাঁরা কিছু জানতেন না। তাঁদের মতামত নেওয়া হয়নি। রেখে দেওয়া হয়েছিল অন্ধকারে। এই পদত্যাগের হিরিক দেখে অনেকে এখন বলতে শুরু করেছে তাতে দলটাই না উঠে যায়। বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে ভোটের মুখে এভাবে গণপত্যাগ কোনওকালে হয়েছে কি না, তা কেউ বলতে পারছে না।
বাগেরহাটে জাতীয় নাগরিক পার্টির ১২জন পদত্যাগ করেছেন। রবিবার, ১২ জানুয়ারি দুপুরে বাগেরহাট প্রেসক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলনে ইস্তফার কথা ঘোষণা করেন বাগেরহাট সদর উপজেলা এনসিপির প্রধান সমন্বয়কারী মো. আলী হোসেন। পদত্যাগকারী বাকি নেতারা হলেন সদর উপজেলা এনসিপির যুগ্ম সমন্বয়কারী কাজি মাহফুজুর রহমান, এনসিপির বাগেরহাট সদর জেলা আশিকুর রহমান (সুমন), শেখ রাসেল, শেখ মিজানুর রহমান, মো. হাসান শেখ, মো. মহিদুল ইসলাম, শেখ জাহিদুল ইসলাম, শেখ নাবিল হোসেন, মো. জনি, মুনিয়া আক্তার জেনি, মো রাতুল আহসান।
রবিবার বাগেরহাট প্রেসক্লাবে আলী হোসেন পদত্যাগ করতে গিয়ে যা বলেছেন, তাতে স্পষ্ট যে এনসিপি এখন জুলাই আদর্শ থেকে পুরোপুরি সরে গিয়েছে। দলের লক্ষ্য হয়ে উঠেছে যে কোনও মূল্যে ক্ষমতায় আসীন হওয়া। আদর্শ, নীতি-নৈতিকতাকে তারা আর গুরুত্ব দিতে নারাজ। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমি ২০২৫ –য়ের ৩ জুন থেকে জাতীয় নাগরিক পার্টির বাগেরহাট সদর উপজেলা শাখার প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে করছি ;কিন্তু ২৪- এর গণ অভ্যুত্থানের যে অঙ্গীকার নিয়ে, নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে প্রত্যয় নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জন্ম ও পথ চলা- তার সঙ্গে বর্তমান প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক সমীকরণে অসাঞ্জস্যতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। যে অঙ্গীকার নিয়ে নতুন বন্দোবস্তের স্বপ্নে দেখেছিলাম, তার ব্যত্যয় হওয়ায় আমার পক্ষে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে পথ চলা সম্ভব নয়। আমার ব্যক্তি, দর্শন এবং (এনসিপি) –য়ের রাজনৈতিক দর্শন সাংঘার্ষিক হওয়ায় আমি আজ থেকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) বাগের হাট সদর উপজেলার প্রধান সমন্বয়কারী পদ হতে পদত্যাগ করছি’।
আলী হোসেন আরও বলেন, ‘দায়িত্ব পাওয়ার পর দলের নাম ব্যবহার করে হামলা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, হাটবাজার দখল,মামলা-বাণিজ্যসহ কোনও ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হয়নি। তাই আজ থেকে এর দায় আমার ওপর বর্তাবে না। ’ এনসিপির ১২জন সদস্য তাঁর সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে পদত্যাগের সিদ্ধান্তি নিয়েছেন বলে লিখিত বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেছেন।
এনসিপির তরফে বলা হয়েছে, পদত্যাগী নেতাদের দলে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কথা চলছে। তবে দলত্যাগী নেতাদের ভাষ্য ভিন্ন। তাঁদের মতে, এসব প্রচেষ্টা মূলত আদর্শগত সংকট সমাধানে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। রবিবার পর্যন্ত সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব তাসমিন জারা, সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ সহ ১৫জন শীর্ষ ও মধ্যমসারীর নেতা পদত্যাগ করেছেন। ছয়জন প্রার্থী তাদের প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করেছেন। সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্থা শারমিন এবং যুগ্ম সদস্যসচিব নাহিদা সারোয়ার নিভা আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ না করলেও জামায়াতের সঙ্গে জোটের পর থেকে তারা আর দলীয় কর্মকাণ্ডের নিষ্ক্রিয় রয়েছেন।












Discussion about this post