‘পিতামহ, আমি এক নিষ্ঠুর নদীর ঠিক পাশে / দাঁড়িয়ে রয়েছি। পিতামহ, / দাঁড়িয়ে রয়েছি, আর চেয়ে দেখছি রাত্রির আকাশে / ওঠেনি একটিও তারা আজ। / পিতামহ, আমি এক নিষ্ঠুর মৃত্যুর কাছাকাছি / নিয়েছি আশ্রয়। আমি ভিতরে বাহিরে / যেদিকে তাকাই, আমি স্বদেশে বিদেশে / যেখানে তাকাই – শুধু অন্ধকার, শুধু অন্ধকার। / পিতামহ, আমি এক নিষ্ঠুর সময়ে বেঁচে আছি। ’
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘মৌলিক নিষাদ’ কবিতার সঙ্গে মিলে যায় বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি। এক নিষ্ঠুর নদীর পাশে, নিষ্ঠুর সময়ে বেঁচে থাকা। রাতের আকাশে তারারা ওঠে। কিন্তু সেই সব তারার বুকে লেখা রয়েছে অজস্র বেদনা, অজস্র যন্ত্রণার কথা। বাংলাদেশ জুড়ে এক আশ্চর্য অন্ধকার। এমন অন্ধকার শেষ কবে দেখা গিয়েছিল, তা কেউ মনে করতে পারছে না। সূর্যের আলো সেই অন্ধকারকে দূর করতে পারছে না। চারিদিকে শুধু হাহাকার। অশ্রুধারা, আর হৃদয় বেদনা।
‘ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে, অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে’ – প্রবাদ যে কতটা খাঁটি সেটা এখন বাংলাদেশের দিকে তাকালে বোঝা যায়। সংখ্যালঘুরা আজ শোষিত, নিপীড়িত। তারা যাতে শান্তিতে থাকতে না পারে, তার একটা পাকাপাকি ব্যবস্থা করে ফেলেছে সে দেশের মৌলাবাদীরা। মুহম্মদ ইউনূস দেশ শাসনের দায়িত্বভার গ্রহণের পর থেকে দেশটা হয়ে উঠেছিল তাসের দেশ। এখন সেটা ত্রাসের দেশ। যেটা সব থেকে বেশি চোখে পড়ছে তা হল সরকারের প্রধান হয়ে একজন পুরোপুরি নির্লিপ্ত। এই সব হিংসাত্মক ঘটনা তাঁকে কোনওভাবেই স্পর্শ করে না। তাঁর এই নির্লিপ্ততা, নিস্পৃহতা মনে করায় নীরোর কথা। রোম যখন পুড়ছিল নিরো তখন বাঁশিতে মগ্ন ছিলেন। অনেকে বলছেন, এখন আর তাঁর করার কিছু নেই। কারণ, বন্দুক থেকে গুলি বেরিয়ে গিয়েছে। যাদের দৌলতে তিনি ‘ক্ষমতাশ্রী’ হয়ে উঠেছিলেন, সেই সব অপশক্তির বিরুদ্ধে তিনি রুখে দাঁড়াবেন কীভাবে? এদের কাঁধে ভর দিয়েই তো গত ১৫-১৬ মাস শাসন করেছেন। এই পরাশক্তিই তো তার বেঁচে থাকার অক্সিজেন। এই পরাশক্তির দৌলতেই তো এই দেশটা মৌলবাদী, জঙ্গিবাদীদের বিচরণভূমিকে পরিণত হয়েছে। একজন দায়িত্বশীল সরকার প্রধান হলে তিনি কোনওভাবেই এই সব অপশক্তিকে প্রশ্রয় দেওয়ার পরিবর্তে তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করতেন।
ভারত কিন্তু পরিস্থিতির দিকে নজর রেখেছে দিল্লি। পরিস্থিতির দিকে নজর রেখেছে ব্রিটেন। সে দেশের সাংসদ প্রীতি প্যাটেল বাংলাদেশ সরকারকে একটি কড়া চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে তিনি লিখেছেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলিতে ১৮ দিনে কম পক্ষে ছয়জন হিন্দুকে হত্যার খবর পাওয়া গিয়েছে। এই স্তরের নিপীড়ন এবং সহিংসতা অগ্রহণযোগ্য।
বাংলাদেশের এই লজ্জার খবর এখন আর শুধু এশিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ছড়িয়ে পড়েছে গোটা বিশ্বে। ফলে, বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের সম্মান যে আজ ধুলোয় গড়াগড়ি খাচ্ছে তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর নির্যাতন ও নিপীড়নের ঘটনা বাংলাদেশের ৩২ জন বিশিষ্ট নাগরিক একটি খোলা চিঠি লিখেছেন। এই খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর রয়েছে – সুলতানা কামাল, খুশী কবির, রাশেদা কে চৌধুরী, জেড আই খান পান্না, ইফতেখারুজ্জামান, আনু মুহাম্মদ, শাহীন আনাম, ফিরদৌস আজিম, শামসুল হুদা, নুর খান, সামিনা লুৎফা, সুমাইয়া খায়ের, সুব্রত চৌধুরী, তবারক হোসেন, স্বপন আদনান, তাসনিম সিরাজ মাহবুব, রোবায়েত ফেরদৌস, জোবাইদা নাসরীন, মনিন্দ্র কুমার নাথ, পাভেল পার্থ, সালেহ আহমেদ, পারভেজ হাসেম, রেজাউল করিম চৌধুরী, শাহ ই মবিন জিননাহ, জাকির হোসেন, সাইদুর রহমান, সাঈদ আহমেদ, দীপায়ন খীসা, জবা তালুকদার, ঈশিতা দস্তগীর, মেইনথিন প্রমীলা ও হানা শামস আহমেদের।
হিন্দুদের উপাসনালয়, বাড়ি, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে হামলা, সংখ্যালঘু খুনের মতো ঘটনায় কড়া ভাষায় নিন্দা করা হয়েছে। খুন হওয়া, দীপু দাস, রানা প্রতাপ বৈরাগী, শরৎ চক্রবর্তী মণিদের নাম চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। চট্টগ্রামে রাউজানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়ির দরজা বন্ধ করে অগ্নিসংযোগ করার ঘটনার নিন্দা করা হয়েছে। চিঠিতে ৩২ বিশিষ্টজন জানিয়েছেন, ইউনূস সরকারকে হিন্দু-সহ দেশের সব সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এরই সঙ্গে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য প্রশাসন এবং সব রাজনৈতিক দলকে আহ্বান জানানো হয়েছে। সেই খোলা চিঠিতে বলা হয়েছে, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনায় যারা উস্কানি দিচ্ছে, তারা এই সব ঘটনার পৃষ্ঠপোষক এবং মদতকারী।












Discussion about this post