গোটা দুনিয়া জেনে গিয়েছে যে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান গোপনে আমেরিকা গিয়েছেন। কেন তাঁর মতন একজন ভিআইপির মার্কিন সফর গোপন রাখা হল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। বাংলাদেশ সরকারের তরফে খলিলুরের এই সফর নিয়ে কোনও বিবৃতি জারি করা হয়নি। পরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার আমেরিকা সফরের খবর প্রকাশ করা হয়। এই সফর নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বেশ কিছু খবর প্রকাশিত হয়েছে। সেই সব খবরের মূল সুর একটাই। খলিলুর রহমান আমেরিকা গিয়ে কার কার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তাঁদের মধ্যে কী কথা হয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। শুক্রবার, ৯ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে এই বিজ্ঞপ্তি জারি করে খলিলুরের আমেরিকা সফরের খবর দেওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রে ওয়াশিংটন ডিসিতে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টে আন্ডার সেক্রেটারি ফর পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্স অ্যালিসন হুকার, সহকারী পররাষ্ট্র সচিব পল কাপুর ও সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডন লিঞ্চের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছেন বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান।
পররাষ্ট্র দফতরের রাজনৈতিক বিষয় আন্ডার সেক্রেটারি অ্যালিসন হুকারের সঙ্গে বৈঠকে ড. খলিলুর আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে অবহিত করেন। সেই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। জবাবে হুকার বলেন, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ় সমর্থন অব্যাহত থাকবে। আশা করা যায় বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন হবে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ। অ্যালিসন হুকার ছাড়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন খলিলুর। বৈঠকে নির্বাচন, ভিসা, বন্ড, বাণিজ্য, বিনিয়োগ রোহিঙ্গা সংকট এবং দ্বিপাক্ষিক স্তরের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দুইয়ের মধ্যে আলাপ হয়।
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বিশেষ আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে অংশ নেন। অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র দফতরের ব্যবস্থাপনা ও সম্পদ বিষয়ক উপসচিব মাইকেল জে রিগাস শপথবাক্য পাঠ করান। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সঙ্গে বাংলাদেশ দূতাবাসের সব কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
এটা সাদা চোখে দেখা রিপোর্ট। এর বাইরেও কিছু থাকে। একটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, খলিলুর রহমানের হাতে ৩৬ পাতার একটি নোট শিট তুলে দেন সেনেট সদস্য জেমস গ্রিন। খলিলুর রহমান বৈঠক করেন পল কাপুর এবং সার্জিও গোরের সঙ্গে। সেই বৈঠকে তাকে ধরে ধরে সাতটি বিষয়ের ওপর আমেরিকার অবস্থা স্পষ্ট করে দেওয়া হয়।
প্রথম বিষয়টি হল, তদারকি সরকারের ভূমিকায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ। বৈঠকে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে কাটা কাটা ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয় যে তাঁর সরকারের তরফে আমেরিকা আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা হবে। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। কোনও আশ্বাস তদারকি সরকার পূরণ করতে পারেনি। দ্বিতীয় বিষয়ে চিনের সঙ্গে বাংলাদেশের তিনটি মউ সই। খলিলুর রহমান পল কাপুর এবং গোরকে বলেন, তাঁর সরকারের আমলে এই চুক্তি সই হয়নি। পত্রপাঠ তাঁরা ওই জবাব খারিজ করে দিয়ে জানান, ইউনূস সরকারের আমলেই এই তিনটি মউ সই হয়েছে। সেটা তারা যথাসময়ে তথ্যপ্রমাণ সহ তুলে ধরবেন। তাছাড়া এই চুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল। তারা তথ্য দিতে অস্বীকার করেছে। উল্টে দিয়েছে ভুল তথ্য। তৃতীয় যে বিষয়ে খলিলুরকে কাপুর এবং গোর তাদের উদ্বেগের কথা জানান, তা হল চিনের সঙ্গে বাংলাদেশের অত্যধিক মাখামাখি। এই দুইয়ের মতে, বাংলাদেশ এখন চিনের কাছে স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছ।
বেজিংকে তিনটি সামরিক স্থাপনা, স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি তৈরির জন্য সে দেশের সঙ্গে চুক্তিকে আমেরিকা ভালো চোখে দেখছে না বলে খলিলুরকে জানিয়ে দেন ওই দুই শীর্ষ মার্কিন আমলা। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে জানিয়ে দেওয়া হয় যে বাংলাদেশ তাদের সার্বভৌমত্ব চিনকে ‘বিক্রি’ করে দিয়েছে। চতুর্থ বিষয় ছিল বাংলাদেশে জঙ্গিগোষ্ঠীর সক্রিয়তা। কাপুর এবং গোর খলিলুরকে বলেন, বাংলাদেশের এখনও ১৭টি ইসালমিক জঙ্গি গোষ্ঠী রয়েছে। তারা রীতিমতো সক্রিয়। তদারকি সরকার এই সব জঙ্গিদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে বাংলাদেশ একটি অনিরাপদ দেশে পরিণত হয়েছে। এই অবস্থায় দেশে হতে চলেছে ভোট। ভোট কতটা অবাধ হবে, তা নিয়ে সন্দিহান আমেরিকা। বাংলাদেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই। বিচারবিভাগের নিরপেক্ষতা শূন্যের কোঠায় চলে এসেছে। খলিলুরকে এটাও জানিয়ে দেওয় হয় ভারতকে কৌশলগতভাবে চাপে রাখার জন্য চিনকে কোনওভাবেই সমৃদ্ধ করা যায় না। আর সর্বশেষ বিষয়টি হল, খলিলুর যেন দেশে ফিরে গিয়ে তদারকি সরকার প্রধানের কাছে এই নিয়ে মুখ না খোলেন। দায়িত্ব তাঁর কাধে তুলে দেওয়া হয়েছে। দায়িত্ব তাঁকে কার্যকর করতে হবে।












Discussion about this post