বিশ্বাস।
সামান্য একটি শব্দ। কিন্তু এর অভিঘাত বেশ গভীর। বিশ্বাস হারিয়ে ফেললে তা আর কোনওভাবে ফিরে পাওয়া যায় না। সেটা ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, সমষ্টির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। প্রযোজ্য সব ক্ষেত্রে। আমাদের প্রতিবেশী বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেটা প্রযোজ্য। হাসিনা আমলে বাংলাদেশ আর হাসিনা-পরবর্তী আমলে বাংলাদেশের যে চরিত্রগত পরিবর্তন হয়েছে, তা নতুন করে আর বলার অপেক্ষা রাখে না। যে দেশটার আত্মপ্রকাশের পিছনে ভারতের অবদান রয়েছে, যে দেশের মানুষ ভারতের চাল, ভারতের পেঁয়াজ, এককথায় ভারত-নির্ভর, সে দেশ আজ সেসব কিছু ভুলে পাকিস্তানের সঙ্গে মাখামাখি শুরু করেছে। পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এখন গলায় গলায়। ঠিক যেন হরিহর আত্মা। তাদের এই হার্দিক সম্পর্কের কারণে ভারত রীতিমতো উদ্বিগ্ন। যেভাবে সেভেন সিস্টার্স কেড়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যেভাবে পদ্মাপারের নেতাদের মুখে ভারত-বিরোধী কথাবার্তা শোনা গিয়েছে, তার প্রেক্ষিতে সাউথব্লক চুপচাপ হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারে না। পশ্চিমবঙ্গ, অসম ও ত্রিপুরায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার কয়েকটি পরিত্যক্ত বিমান ঘাঁটি পুনরায় চালু করার পরিকল্পনা নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
এমন এক সময়ে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে যখন প্রতিবেশী বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্ক ইতিহাসের সর্বনিম্ন স্তরে অবস্থান করছে। মূলত উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের একমাত্র স্থলসংযোগ এই সরু করিডরটির নিরাপত্তা নিয়ে নয়াদিল্লি বর্তমানে কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। ভারতের এই তৎপরতার পেছনে বাংলাদেশের রংপুর বিভাগের লালমনিরহাট বিমানঘাঁটি পুনর্নির্মাণের উদ্যোগকে একটি বড় কারণ হিসেবে দেখছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা। লালমনিরহাট বিমানঘাঁটিটি ভারতের শিলিগুড়ি করিডরের খুব কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ায় ভারতের সামরিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী যেসব এয়ারস্ট্রিপ সংস্কার করা হবে সেগুলো হলো পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ির আমবাড়ি ও পাঙ্গা, দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাট, মালদহের ঝালঝালিয়া ও আসামের ধুবড়ি। এর আগে কোচবিহার ও আসামের রূপসী বিমানবন্দর দুটি সফলভাবে সচল করা হয়েছে। তবে এসব পরিত্যক্ত এয়ারস্ট্রিপ পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে বেশ কিছু কারিগরি চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে প্রতিরক্ষা সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তবে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জোর দিয়ে জানিয়েছে, লালমনিরহাটের ওই বিমানঘাঁটির প্রধান ব্যবহার হবে নিজস্ব জাতীয় প্রয়োজনে, অন্য কোনো দেশেরজন্য নয়। তবে ভারতীয় সূত্রের দাবি, নয়াদিল্লি কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। এরই মধ্যে ভারত এই অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করেছে। পশ্চিমবঙ্গের চোপড়া, বিহারের কিষানগঞ্জে এবং আসামের ধুবড়িতে ‘লাচিত বরফুকন’ নামে তিনটি নতুন সেনাঘাঁটি স্থাপন করা হয়েছে। বর্তমানে এয়ারপোর্টস অথোরিটি অব ইন্ডিয়া (এএআই) পশ্চিমবঙ্গের বিমানক্ষেত্রগুলোর দায়িত্ব রাজ্য সরকারের হাতে তুলে দিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভারত চায় এই রানওয়েগুলো যেন সর্বদা জরুরি অপারেশনাল কার্যক্রমের জন্য প্রস্তুত থাকে। বিশেষ করে সংকটের সময় দ্রুত সেনা মোতায়েন বা রসদ সরবরাহের ক্ষেত্রে এই ঘাঁটিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তবে এসব পরিত্যক্ত এয়ারস্ট্রিপ পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে বেশ কিছু কারিগরি চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে প্রতিরক্ষা সূত্রগুলো জানিয়েছে। দীর্ঘ কয়েক দশক অব্যবহৃত থাকায় অনেকগুলো বিমানক্ষেত্র এখন ঘন জঙ্গলে ঢাকা পড়েছে, রানওয়েগুলো ভেঙে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে রানওয়ের চারপাশ ঘিরে জনবসতি গড়ে উঠেছে। ফলে বড় ধরনের যুদ্ধবিমানের অপারেশনের জন্য এগুলো বর্তমানে উপযুক্ত না হলেও সামান্য মেরামতের মাধ্যমে জরুরি পরিস্থিতিতে হেলিকপ্টার বা ছোট সামরিক বিমান নামানোর উপযোগী করে তোলার চেষ্টা চলছে। সীমান্তের ওপারে ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে সুরক্ষিত রাখতে এই কৌশলগত প্রতিরক্ষা পরিকাঠামো গড়ায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।












Discussion about this post