ভাবা যায়?
ভাবা যায় না ঠিকই। কিন্তু তারপরেও ভাবতে হচ্ছে। তার কারণও রয়েছে। যাঁদের আন্দোলন জনগণের দ্বারা নির্বাচিত একটি সরকারের পতন ঘটিয়েছিল, তাদের সেই আন্দোলনকে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে। দিচ্ছে কে? দিচ্ছে এমন একটি সরকার, যে সরকারের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে। শুধু মুখে ঘোষণা নয়, তার জন্য সরকারের তরফে গেজেটও প্রকাশ করা হবে। এটা শুধু লজ্জাজনক নয়। এটা একটি সরকারের নির্লজ্জ আস্ফালন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটা একদিক দিয়ে দায়মুক্তির রাজনীতি। এই স্বীকৃতির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হচ্ছে, সরকার সেই যোদ্ধাদের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। যে কোনও কারণেই হোক, এতোদিনে সেই প্রতিশ্রুতি পালন করতে পারেনি। সরকার আর দেরি করতে চাইছে না।
গোটা দুনিয়া জানে, ২০২৪-য়ের জুলাই-অগাস্টে পদ্মাপারে ঠিক কী হয়েছিল? প্রথম দিকে অনেকের মনে হয়েছিল এই আন্দোলন ছিল স্বতর্স্ফূর্ত। দীর্ঘদিন ধরে মানুষের মনের ভিতরে জমে থাকা ক্ষোভের উদগিরণ। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে এই আন্দোলনের পিছনে মদত ছিল একটি স্বার্থাণ্বেষী গোষ্ঠীর। একটি নির্বাচিত সরকারকে ফেলে দেওয়ার নীল নকশা তৈরি করেছিল ডিপস্টেট। কারণ, পদ্মাপারে যে নেত্রীর হাতে ক্ষমতা রয়েছে, তাঁর মাথা কোনওভাবেই নত করা যাবে না। নেত্রী পরবর্তীকালে বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সেটা পরিষ্কার করে জানিয়ে দেন। বলেন, আমেরিকার শর্ত মেনে নিলে তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে হত না। শর্ত মানতে অস্বীকার করায় তাঁকে সরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। আমেরিকার যে স্বার্থ খুব একটা পূরণ হয়েছে, তা নয়। তাই তারাও এখন চাইছে পদ্মাপারে প্রয়োজন পালাবদলের। কারণ, এই সরকার না হোমে লাগে, না যজ্ঞে। সরকারের কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণে দক্ষিণ এশিয়ায় একটা অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এতে মার্কিন স্বার্থে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। তাই, এই সরকার যত তাড়াতাড়ি বিদায় হয়, ততই মঙ্গল।
আর সরকারের বিদায়কালে জুলাই যোদ্ধাদের স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। কী সেই স্বীকৃতি, যা দেওয়ার জন্য সরকার উঠে পড়ে লেগেছে?
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদের একটি বৈঠক বসে। সেই বৈঠকে জুলাই যোদ্ধাদের আন্দোলন নিয়ে সবিস্তার আলোচনা হয়। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, এই আন্দোলনের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের সব রকম দায় থেকে মুক্তি দেওয়া হবে। এর জন্য আনা হবে একটি অধ্যাদেশ, যার শিরোনাম ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ’ অধ্যাদেশ। আগামী পাঁচ-সাত দিনের মধ্যে সরকার এই নিয়ে একটি গেজেট প্রকাশ করবে।
আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এই অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী সরকারে পতন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে জুলাই-অগাস্টের রাজনৈতিক প্রতিরোধের সময় সংঘটিত কার্যাবলীর জন্য গণঅভ্যুত্থানকারীরা দায়মুক্তি পাবেন। তাদের বিরুদ্ধে যদি কোনও আদালতে মামলায় দায়ের হয়ে থাকে, তাহলে সেই সব মামলা সরকার প্রত্যাহার করে নেবে। নতুন করে তাদের বিরুদ্ধে আর মামলা করা যাবে না। তবে ব্যক্তিগত লোভ বা সংকীর্ণ স্বার্থে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড দায়মুক্তির বাইরে থাকবে। ’
আসিফ নজরুল বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে রাজনৈতিক প্রতিরোধের উদ্দেশে সংঘটিত ক্যারাবলি থেকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিরোধ বলতে বোঝানো হয়েছে, ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে সংঘটিত কার্যা বলির দায়দায়িত্ব থেকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তি দেওয়া।’ তবে তিনি এটাও জানিয়ে দেন, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় যদি কোনও হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকে, যার সঙ্গে জুলাই আন্দোলন সম্পৃক্ত নয়, সে ক্ষেত্রে এই অধ্যাদেশের মধ্য দিয়ে দায়মুক্তি দেওয়া যাবে না। তিনি সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, যদি লোভের বশবর্তী হয়ে, প্রতিশোধপরায়ণ ও সংকীর্ণ স্বার্থে হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকে, তা হলে এ আইনের মাধ্যমে তাকে দায়মুক্তি দেওয়া বা পাওয়া যাবে না। এ অধ্যাদেশটি তাদের জন্য করা হয়নি। আইনটি করা হচ্ছে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য সংঘটিত কার্যা বলির ক্ষেত্রে। সে কার্যােবলিতে যারা সমন্বিতভাবে জড়িত ছিলেন, তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হচ্ছে।












Discussion about this post