এই বাংলা প্রবাদটির কথা নিশ্চই আমাদের সকলের জানা আছে – টাকা থাকলে ভূতের বাপেরও শ্রাদ্ধ হয়।
প্রতিবেদনের সঙ্গে এই বাংলা প্রবাদটির সম্পর্ক কোথায়, সেটা অবশ্যই আমাদের পাঠক এবং দর্শকদের জানিয়ে দেওয়া হবে। তার আগে কিছু কথা। নরেন্দ্র মোদি প্রথম দফায় সরকার গঠনের পর ঘন ঘন বিদেশ যেতেন। তা নিয়ে কম সমালোচনা হয়নি। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর এই সফর নিয়ে ট্রোল করা হয়েছে। একসময় তো তার পরিচয় আমূল বদলে গিয়েছিল। তাঁকে ডাকা হত অনাবাসী ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বলে, সংক্ষেপে এনআরআই প্রাইমিনিস্টার। জনগণের করের পয়সায় একজন প্রধানমন্ত্রীর এভাবে ঘন ঘন বিদেশ সফর সরকারকে প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করে। সমালোচনার জেরে মোদি তার অভ্যাস পরিবর্তন করেন।
এই ঘটনার উল্লেখ করার কারণ আমাদের প্রতিবেশী দেশের একজনের ‘দান-খয়রাতির’ একটি বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ্য এসেছে। গত এক বছরে তিনি যে পরিমাণ টাকা খরচ করেছেন, সেটাকে ডাকাতি বললে অত্যুক্তি হবে না। ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ’ ফাঁকা করে দিয়েছেন। তাঁর এই কর্মকাণ্ড মনে করায় ‘হীরক রাজা’ ছবির এই গানের কথা –
‘রাজা এতই রসিক/ রাজা এতই দরাজ / রাজা এতই মিশুক /এত চিকন মেজাজ / মোদের প্রাণ ভরে গেছে তাই/ মোরা সেই কথা জানাই/। …. বলো হীরক রাজার জয় / বল, এমন রাজা ক’জন রাজা হয়/ কত দেশে দেশে ঘুরে শেষে / মন বলে হীরকে এসে / এমন রাজা কোনও দেশে নাই/ বলে এমন রাজা কোনও দেশে নাই,/ মোরা সেই কথা জানাই। ’
পদ্মাপারের রাজার মেজাজের সঙ্গে হীরক রাজার মেজাজ কিন্তু হুবহু মিলে যায়। ‘রাজা’ একদিকে যেমন রসিক, খরচ করতে দরাজ হস্ত। মেজাজ তাঁর অত্যন্ত চিকন। সব সময় তুরীয় মেজাজে তাঁকে থাকতে দেখা গিয়েছে। আর মেজাজ চিকন করে রাখতে তিনি দরাজ হাতে টাকা খরচ করেছেন। বিদেশ সফর করেছেন। বিদেশ সফরের স্বাদ তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের পাইয়ে দিয়েছেন। খেয়েছেন একাবারে কব্জি ডুবিয়ে। আর দেশের অর্থনীতি, বলা ভালো আস্ত দেশটাকে পদ্মায় ডুবিয়ে ছেড়েছেন। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে অনেকেই সরকারে আসীন হয়েছে। কিন্তু কোনও সরকার এভাবে মুড়ি মুড়কির মতো টাকা খরচ করেনি। এটা কোনও শত্রু দেশের মন গড়া রিপোর্ট নয়। ইউনূস সরকারের বন্ধু প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ’ সরকারের এক বছরের খরচ খরচার একটা হিসেব প্রকাশ করেছে। যা দেখে চক্ষু চড়কগাছে ওঠার জোগাড়।
রিপোর্টের মূল কথা আয়ের তুলনায় ব্যয় হয়েছে বেশি, যার ফল ভোগ করতে হবে পরবর্তী সরকারকে। প্রথমেই ইউনূসের বিদেশ সফরের একটি হিসেব পেশ করা যাক। প্রতিটি ট্রিপে গিয়েছেন চার্টার্ড বিমানে করে। কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে এই সব সফর নিশ্চই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সফরে নিয়ে গিয়েছেন এমন অনেককে যাদের যাওয়ার কোনও প্রয়োজন ছিল না। অন্যখাতে খরচ হয়েছে সাড়ে ১৭ কোটি টাকা। এভাবেই গত এক বছরে ৩০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
দ্বিতীয় খাত নির্বাচনী প্রস্তুতি। সরকার বলছে, এই নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ করতে তারা বদ্ধপরিকর। আর তার জন্য সরকারকে টাকা পয়সা খরচ করতে হয়েছে। কী পরিমাণ টাকা খরচ করেছে, এবার সেটা তুলে ধরা যাক। ভোটার শিক্ষা, পর্যবেক্ষক প্রশিক্ষক এই তিন শিরোনামে খরচ হয়েছে আ়ডাইশো কোটি টাকা। সব থেকে বড়ো ঘটনা ভোটের জন্য বিশেষ একটি সফটওয়্যার ক্রয় করা। এর জন্য সরকার দরপত্র প্রকাশ করে। দরপত্রে অংশ নেয় দুটি সংস্থা। যার মধ্যে একটি সংস্থাকে অনেক আগেই কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। তারা নতুন নামে নতুন একটি কোম্পানি খোলেন। ক্রয় কমিটির প্রধান বলেন, সময় কম থাকায় দ্রুত এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে, যে সফটওয়্যারের বাজারদর সর্বোচ্চ ২৫ কোটি হওয়ার কথা, তার চূড়ান্ত মূল্য ধরা হয়েছে ১০৮ কোটি টাকা।
তৃতীয় খাত নিরাপত্তা। ইউনূস ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর গুজব, রাজনৈতিক খুন, সাম্প্রদায়িক হামলা এই তিনটিকে ইস্যু করে গঠন করা হয়েছে বিশেষ র্যা পিড অ্যাকশন গার্ড। নতুন বাহিনীর জন্য বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, ড্রোন কিনতে ব্যয় হয়েছে ৩০০ কোটি টাকারও বেশি। আর একই সময়ে থানায় গুলির বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে ১০ %। নতুন ফোর্স গঠনের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু ছিল? আর যে সংস্থার থেকে ড্রোন কেনা হয়েছে, সেই সংস্থার সঙ্গে দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টার ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে। তা নিয়ে গণমাধ্যমে খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
চতুর্থ খাত মিডিয়া ব্যবস্থাপনা। ইউনূস ক্ষমতায় আসীন হওয়ার প্রথম মাসেই একটি কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটির জন্য শুধু বিজ্ঞাপন বাবদ খরচ হয়েছে ১৩৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রমোশন বাবদ খরচ হয়েছেন ২৫ কোটি টাকা। এর বড়ো অংশ চলে গিয়েছে বিদেশি ফার্মের হাতে। ক্যাপাসিটি বিল্ডিংয়ের নামে খরচ হয়েছে আরও ২৫ কোটি।
পঞ্চম খাত উন্নয়ন প্রকল্প। নামটা বেশ গালভরা। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। শুধু মাত্র একটি কমিটি গঠন করা ছাড়া। গত ডিসেম্বরে অনুমোদন পায় স্মার্ট গ্রাম প্রকল্প। ব্যয় ধরা হয়েছে ৪০০ কোটি টাকা। গ্রামে বিদ্যুৎ নেই। অথচ ওয়াইফাইয়ের জন্য টাওয়ার বসানো হচ্ছে। কাজ পেয়েছে সাবেক এক উপদেষ্টার নিকটজন। প্রকল্পের মূল পরিকল্পনা একজন উপদেষ্টার। প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ টাকার পুরোটাই নিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ষষ্ঠ খাত সামাজিক নিরাপত্তা। সব থেকে বড়ো লুঠপাঠ হয়েছে এই খাতে। চাল কেনা হয়েছে আড়াই লক্ষ টন। কিন্তু গুদামে মজুত রয়েছে এক লক্ষ ৯৮ হাজার টন। বাকি চাল চলে গিয়েছে সিন্ডিকেটের কাছে। এক বছরে সরাকারের মোট ব্যয় ৩০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি।
তাহলে বোঝা গেল রাজার মেজাজ কতটা চিকন। রাজা কতটা রসিক।












Discussion about this post