বাংলাদেশে আর কয়েকদিন পরই জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেই সঙ্গে অনুষ্ঠিত হবে গণভোট। আর এই গণভোট নিয়েই যত গোলমাল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তথাকথিত গণভ্যুত্থানের জেরে ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী লীগ সরকার। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোনও ভাবে নিজের প্রাণ বাঁচিয়ে ভারতে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতায় আসার পর থেকে বাংলাদেশে একটাই প্রচার চলছে যে জুলাই সনদের রূপায়ন। আর এটা করতেই যে গণভোটের আয়োজন সেটাও এখন সকলে জানেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, গণভোটের চারটি প্রশ্ন থাকলেও একটি মাত্র ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ উত্তর দিয়ে ভোট দিতে হবে বাংলাদেশের ভোটারদের। যা নিয়ে বিতর্ক কম হচ্ছিল না।
বিষয়টি এমন যে গণভোটে এই বিষয়ে মতামত চাওয়া হচ্ছে বাংলাদেশের জনগণের জন্য। যেমন, “আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ বা সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?”
প্রথম প্রশ্ন হল, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হইবে।
দ্বিতীয় প্রশ্ন হল, আগামী জাতীয় সংসদ হইবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হইবে এবং সংবিধান সংশোধন করিতে হইলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হইবে।
তৃতীয় পক্ষ হল, সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল হইতে ডেপুটি স্পীকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাসহ তফসিলে বর্ণিত যে ৩০টি বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য হইয়াছে- সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য থাকিবে।
চতুর্থ প্রশ্ন হল, জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হইবে।
এই চারটি প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা আলাদা আলাদা হলেও উত্তর একটাই দিতে হবে। এখানেই প্রশ্ন উঠেছিল, তবে অনেকেই মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু সময় যত এগোচ্ছে ততই মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের মুখোশ খুলছে। প্রধান উপদেষ্টার সরকারি ফেসবুক পেজে জোরকদমে চলছে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ চিহ্নে ভোট দেওয়ার আর্জি। যা নিয়ে বিতর্ক কম হচ্ছে না। আবার এনসিপির দুই নেতা নাহিদ ইসলাম এবং নাসিরুদ্দিন পাটওয়ারী যখন একই দাবি নিয়ে ব্যানার-হোর্ডিং ছাপিয়ে প্রচার করছেন, তখন তাঁদের শোকজ করছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। এটা যেন সেই হীরক রাজার দেশ বা মগের মূলুক। যেখানে নিয়ম কানুন সর্বনেশে। সরকার যদি একই দোষ করে, তাহলে কোনও শাস্তি নেই, আবার একই দোষে অন্যরা দোষী হচ্ছেন। এটাই গণভোট নিয়ে দ্বিচারিতা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে কেউ কেউ বলছেন, বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন হোক বা না হোক, একটি ‘হ্যাঁ–না’ ভোটের মাধ্যমে সরকার দেখাতে চাইছে যে দেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চলছে। আর সেটা যেন হ্যাঁ-তে পড়ে সেটাও নিশ্চিত করতে চাইছে ইউনূস সরকার। তাই তাঁদের সরকারি যাবতীয় দফতর এবং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রচার করতে নির্দেশ দিয়েছে যাতে সাধারণ মানুষ হ্যাঁ-তে ভোট দেন। তাঁরা গণভোট বা জুলাই সনদে কি বলা আছে সেটা বুঝুক বা না বুঝুক।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই গণভোটে যে চারটি প্রশ্ন রাখা হয়েছে তাতে প্রথম তিনটি হচ্ছে খুবই সাধারণ। কিন্তু শেষ প্রশ্নটি হল মারাত্মক। যা জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে বেশি সাহায্যকারী। আর মুহাম্মদ ইউনূস এবং তাঁর দোসররা এটাই চান। যত বেশি হ্যাঁ-তে ভোট পড়বে, ততই তাঁদের লাভ। কিন্তু এর মধ্যেও একটা কাঁটা আছে। সেটা হল শেখ হাসিনার ভোট বর্জনের আহ্বান। যদি সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে একটা বড় অংশের মানুষ ভোটমুখী না হন, তাহলে মুহাম্মদ ইউনূসের সমস্ত প্রচার ও প্রচেষ্টা মাঠে মারা যাবে।












Discussion about this post