২৪-য়ের জুলাই অগাস্ট আন্দোলনের প্রেক্ষিতে হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে হয়েছে। আর বিক্ষোভের আগুন জন্ম দিয়েছিল দুটি জ্বলন্ত প্রশ্নের। প্রথম প্রশ্ন ছাত্র জনতার আন্দোলন কি স্বতস্ফূর্ত ছিল? দ্বিতীয় প্রশ্ন হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার কুশলীব কে? যে কোনও গণআন্দোলন থিতিয়ে যাওয়ার পর আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়। প্রথম দিকে বলা হয়েছিল বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার আন্দোলন ছিল স্বতস্ফূর্ত। হাসিনা সরকারের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলে জমে থাকা ক্ষোভের উদগিরণ। পরবর্তীকালে দেখা গেল, এই আন্দোলন পুরোপুরি স্বতস্ফূর্ত ছিল না। এটা ছিল পরিকল্পিত। একটি সরকারের পতন ঘটানোর নীল নকশা। আর এই আন্দোলন আমেরিকার মস্তিষ্ক প্রসূত। ভূরাজনৈতিক ভাষ্যে ডিপ স্টেট।
ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পর হাসিনা তাঁর ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়া এবং ছাত্র-জনতার আন্দোলন নিয়ে গণমাধ্যমে দিয়েছেন সাক্ষাৎকার। প্রথম দিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হাসিনা কিন্তু আমেরিকার বিরুদ্ধে একটি কথাও বলেননি। উল্টে বলতে শোনা গিয়েছিল যে আমেরিকা তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছে বলে তিনি মনে করেন না। পরবর্তীকালে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হাসিনা সরাসরি আমেরিকার বিরুদ্ধে আঙুল তোলেন। জানিয়ে দেন, তিনি আমেরিকার দাবি মেনে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ তাদের হাতে তুলে দিলে ক্ষমতা থেকে তাঁকে সরতে হত না। কিন্তু দেশের স্বার্থে, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের স্বার্থে তাঁর পক্ষে কোনওভাবেই এটা করা সম্ভব ছিল না। দেশকে আমরিকার হাতে সঁপে দেওয়ার পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রীর কুর্সি ছেড়ে দেওয়াকেই তিনি অগ্রাধিকার দিতে চেয়েছেন। হাসিনার মুখে মার্কিন ষড়যন্ত্রের তত্ত্বে সিলমোহর দিলেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মাজার। একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাঁকে বলতে শোনা গেল – “শেখ হাসিনাকে সরাবার জন্য তোমাদের পরিশ্রমের দরকার নেই। ওটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরিয়ে দেবে। তোমাদের কাজ হবে রাষ্ট্রটা কীভাবে গঠন করবা ওটা ভাবো।” নিউজ বর্তমান দুটি ভিডিওর সত্যতা যাচাই করেনি।
কে এই ফরহাদ মজহার?
সেই উত্তর পেতে গেলে আমাদের টাইম মেশিনে চেপে একটু পিছনের দিকে যেতে হবে।
২০২৪-য়ের ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকারের যে পতন হল, সেই পতন নিয়ে নানা প্রশ্ন ঘুরতে শুরু করে। পতন ছাত্রদের আন্দোলনে কি না? আমেরিকার সরাসরি হস্তক্ষেপে হয়েছিল? সেই প্রশ্নটা বারবার ফিরে ফিরে আসছে। আমেরিকা নানা ধরনের ভূমিকা রেখে, নানা মহলকে কাজে লাগিয়ে শেখ হাসিনা সরকারকে উৎখাত করেছিল? প্রফেসর ইউনূসকে আমরা দেখেছিলাম বিল ক্লিন্টন ফাউন্ডেশন আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়ে ইউনুসকে বলতে শোনা যায় সাধারণ কোনও হুট করে হয়ে ওঠা ব্যাপার না। এটা মেটিকুলাস ডিজাইনে এই আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে। এই মেটিকুলাস ডিজাইনের মাস্টারমাইন্ড মাহফুজ আলম। যদিও পরবর্তীকালে অনেকেই এর সঙ্গে সহমত পোষণ করেননি। মাহফুজ আলম একা নয়, এর সঙ্গে আরও অনেকে জড়িয়ে। আর সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করেছে। বিতর্কটা আজও মেটেনি। দেড় বছৎ ধরে চলছে। এই বিতর্কটা আবারও উস্কে দিলেন কবি এবং জুলাই আন্দোলনের চিন্তা ও মননের অন্যতম কারিগর কবি ফরহাদ মজহার। জুলাই আন্দোনকারীদের সঙ্গে অনেক আগে থেকেই তাঁর সম্পর্ক ছিল। এই ভিডিও বার্তা যখন তিনি দিচ্ছেন, সেই সময় হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদে। কোটা আন্দোলন ধীরে ধীরে সংঘটিত হচ্ছে। আওয়ামী সরকারের বিরুদ্ধে পথে নামার চিন্তাভাবনা চলছে। সেটা জুলাই মাসের প্রথম দিকের ঘটনা। তার অর্থ ফরহাদ মজহারের কাছে খবর ছিল যে হাসিনা সরকারের পতন ঘটাবে আমেরিকা। ছাত্রদের তা নিয়ে ভাবার কোনও প্রয়োজন নেই। তাদের ভাবার বিষয় হাসিনা পরবর্তীতে রাষ্ট্র কীভাবে গঠিত হবে, তা নিয়ে।
কিন্তু যে আশা নিয়ে সরকারের পতন হয়েছে, সেই আশা যে পূরণ হয়নি, তদারকি সরকার যে সেই প্রত্যাশা পূর্ণ করতে পারেনি, সেটা স্পষ্ট হয়ে যায় তাঁর কথায়। বাংলাদেশের বিশিষ্ট এই বুদ্ধিজীবী বলছেন,
আমরা তখনই বুঝতে পেরেছি যে বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে একটা বিশ্বাস ঘাতকতা করা হচ্ছে। এবং আমরা আরও বড়ো বিপদের দিকে যাচ্ছি। আমরা মূলত একটা বড়ো বিপর্যয় দেখতে পাচ্ছি। এটা সাধারণ মানুষকে যে প্রতিশ্রুতি আমরা দিয়েছিলাম তাদের জীবনের প্রতি, তাঁদের দৈনন্দিন জীবনব্যবস্থার কিছুটা তাদের দুঃখ লাঘবের জন্য… আমরা দেখছি তার প্রতি তো কোনও প্রকার তো আমরা কিছু করিনি। আমরা মূলত পুরনো লুঠেরা মাফিয়া শ্রেণিকেই আবার পুনর্বাসিত করার জন্য নির্বাচনের কথা বলছি।












Discussion about this post