দলের প্রতি সাধারণ আওয়ামী লীগ কর্মীদের দরদ, ভালোবাসা আগে থেকেই পরিক্ষীত। জান যায়, তবু দল ছাড়ে না – এমন প্রবাদও সচল। তাছাড়া বিরোধী দল হিসেবে আওয়ামী লীগের চেয়ে সেরা আর কেউ নেই – একথাও জানে সবাই। কিন্তু এবারের চিত্র আলাদা। কারণ আওয়ামী লীগ না থাকছে সরকারে, না তারা বিরোধী দল হিসেবে জায়গা করে নেবে সংসদে। বর্তমান পরিস্থিতি অন্তত তেমনটাই বলছে। তাই, বলে কি আওয়ামী লীগ হাওয়া হয়ে যাবে? বিশ্লেষকেরা বলছেন না। বরং কৌশল করেই বেঁচে থাকার পথটা তৈরি করছেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা।
সন্দেহাতীতভাবে আওয়ামী লীগের কোটি কোটি কর্মী সমর্থকদের কাছে বিএনপি ছাড়া দ্বিতীয় কোনও বিকল্প নেই। জামায়াত ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগ বলে কিছু থাকবে না, সেটা দলের তৃণমূল স্তরের নেতা থেকে শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে স্পষ্ট। মুক্তিযুদ্ধ দেশপ্রশ্নে বড়ো বিবাদ। জামায়াত নেতাদের ফাঁসিতে ঝোলানোর পর একটা হিসেবও বাকি। ওদিকে দেশ, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলছে বলতে গেলে একমাত্র বিএনপি। তাছাড়া সারা দেশে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে কমবেশি যোগাযোগ সবসময় ছিল। পঞ্চগড় থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফরিদপুর থেকে চট্টগ্রাম – দেশের মানচিত্রে যেখানেই হাত রাখা হোক না কেন, চিত্রটা সর্বত্র এক। দলে দলে, স্রোতের মতো আওয়ামী লীগ কর্মীরা ভিড় করছেন বিএনপির স্থানীয় কার্যালয়গুলিতে। হাতে রজনীগন্ধা বা ধানের শিস আর মুখে জিয়াউর রহমান এবং তারেক জিয়ার নামে স্লোগান। দৃশ্যত মনে হচ্ছে, দীর্ঘ দেড় দশকের ক্ষমতার দাপট দেখানো দলটির তৃণমূল এখন অস্তিত্ব রক্ষায় মরিয়া।
গত ১৫ জানুয়ারি বিকেলে বিকেলে চাঁদপুর জেলা বিএনপি কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে শতাধিক আওয়ামী লীগ কর্মী দল বদল করেন। নবাগতদের বরণ করে নেন চাঁদপুর বিএনপি উপজেলা সভাপতি শাহজালাল মিশন। ছিলেন সম্পাদক হযরত আলী বেপারী এবং জেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ বাহার প্রমুখ। নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে শাহজালাল মিশন বলেন, “ আপনাদের যোগদান দলের শক্তি হিসেবে কাজ করবে। আপনারা আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড দেখেছেন। এখন বিএনপির নীতি আদর্শকে ভালোবেসে আমাদের সঙ্গে এসেছেন। পাশাপাশি বেগম জিয়া ও তারেক রহমানের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দেখে আপনারা উৎসাহিত হয়েছেন। ” নবাগত নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বিএনপি নেতারা বলেন, দলের আদর্শ ও শৃঙ্খলা বজায় রেখে ঐক্যবদ্ধভাবে আগামীদিনে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। একই ঘটনা ঘটেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়।
এই দুটি ঘটনার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় আওয়ামী লীগের প্রতাপশালী নেতা বলতে যাদের বোঝানো হত তারাই এখন মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে অবলীলায় বলছেন, আমরা এখন মনে প্রাণে বিএনপি ছিলাম। পরিস্থিতির চাপে আওয়ামী লীগ করতে বাধ্য হয়েছিলাম। রাজনীতির মাঠে এই বয়ানটি এখন সার্ভাইবাল কিট বা বাঁচার একমাত্র হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল এই ভোল পাল্টানো কি এক অজানা ভয় থেকে ? না কি এর পিছনে রয়েছে সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক চাল? আওয়ামী লীগের এই সব নেতাকর্মীদের বিএনপি প্রীতির সব চেয়ে বড়ো মনস্তাত্তিক কারণ হল নিরাপদ আশ্রয়। পাঁচ অগাস্ট পরবর্তী পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের তৃণমূল থেকে শুরু করে মাঝারি সারির নেতারা যে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, তা নিয়ে কোনও প্রান্তেই কোনও দ্বিমত নেই। সেটা অস্বীকার করার কোনও উপায়ও নেই। কিন্তু তারা জামায়াত বা অন্য কোনও দলে যাচ্ছে না?। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এখানেই কাজ করছে আওয়ামী লীগের পুরনো রাজনৈতিক হিসেবে।
জামায়াত বা অন্য ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলির প্রতি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের একটি ঐতিহাসিক ভীতি কাজ করে। গত ১৫ বছরে জামায়াতের ওপরে যে স্টিম রোলার চালানো হয়েছে – যুদ্ধাপরাধের বিচার থেকে শুরু করে নিবন্ধন বাতিল – সব কিছুর হিসেব জামায়াতের কাছে কড়ায় গণ্ডায় আছে। আওয়ামী লীগররা ভালো করেই জানে সেখানে যাওয়া যাবে না কোনওভাবেই। বিএনপি তাদের কাছে মডারেট দল হিসেবে দেখে এসেছে। তৃণমূল স্তরে দুই দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে একটা যোগাযোগ ছিল। বাজারে বা চায়ের দোকানে প্রতিদিন যে বিএনপি কর্মী বা নেতাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতা বা কর্মীদের দেখা হত, সেই সম্পর্ক এখন সেফটি বাল্ব হিসেবে কাজ করছে। আওয়ামী লীগের কর্মীরা মনে করছেন বিএনপি নেতারা ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে তাদের শারীরিকভাবে নিগৃত করবেন না। এই সফট কর্নার বা নমনীয় জায়গাটি এখন আওয়ামী লীগারদের বিএনপিতে যোগদানের প্রধান গেটওয়ে। তাঁরা ভাবছেন বিএনপি ক্ষমতা এলে বা নেতৃত্বেথাকলে তাদের জানটা বাঁচবে। যেটা জামায়াতের ক্ষেত্রে নিশ্চিত নয়।
তবে এই পরিস্থিতির সঙ্গে ইতিহাসের এক অদ্ভূত মিল খুঁজে পাচ্ছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। গত ১৭ বছর আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন বারবার অভিয়োগ উঠত, ছাত্রদল এবং শিবিরের একটি অংশ কৌশলে ছাত্র লীগে ঢুকে পড়েছে। তারা কৌশলে সেখানে মিশে গিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করেছে। সময়মতো ভিতর থেকে আওয়ামী লীগকে দূর্বল করেছে। আজ যেন সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।












Discussion about this post