বাংলাদেশে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে চলেছে বহুল প্রতীক্ষিত ১৩ তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ গণভোট। তবে নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের একের পর এক ব্যয়বহুল প্রকল্প অনুমোদন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষরের হিড়িক নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্কের ঝড় উঠেছে।সাধারণত নির্বাচনের আদর্শ আচরণবিধি অনুযায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কেবল দৈনন্দিন রুটিন কাজ চালানোর কথা থাকলেও, এই সরকার যে গতিতে বিশাল অঙ্কের প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্যিক চুক্তি করছে, তাকে অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।গত ১ ডিসেম্বর থেকে ২৫ জানুয়ারির মধ্যে ঢাকা প্রায় ১ লক্ষ ৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৬৪টি প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে ৪০টিই একেবারে নতুন প্রকল্প। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও চীনের সঙ্গে যুদ্ধতরী এবং ১৪টি বোয়িং বিমান কেনার মতো বড় চুক্তিও এই তালিকায় রয়েছে। সমালোচকদের প্রশ্ন, যে সব দীর্ঘমেয়াদী নীতিগত সিদ্ধান্ত কেবল একটি নির্বাচিত সরকারের নেওয়ার কথা, সেগুলো কেন অন্তর্বর্তী সরকার বিদায়বেলায় তড়িঘড়ি করে সম্পন্ন করছে? বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি গোপন বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের তোড়জোড় নিয়েও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
এই বিশাল ব্যয়ের চাপের পাশাপাশি প্রস্তাবিত নবম পে-কমিশন বাস্তবায়নের এক লক্ষ কোটি টাকার বেশি দায় এবং ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক ঋণের বোঝা নিয়ে নবনির্বাচিত সরকারকে এক চরম অগ্নিপরীক্ষার মুখে পড়তে হবে। ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের আশঙ্কা, অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি করা এই আর্থিক বাধ্যবাধকতা পরবর্তী সরকারের স্বাধীনভাবে নীতি নির্ধারণের পথ সংকুচিত করে দিতে পারে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের লড়াই নয়, বরং এই বিশাল অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সামাল দেওয়ার এক নতুন সংগ্রামের সূচনা হতে চলেছে।
সোমবার স্বাক্ষরিত এই নতুন চুক্তি অনুযায়ী, আমেরিকায় রফতানি হওয়া বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওয়াশিংটন। উল্লেখ্য, কিছুদিন আগেই ভারত-মার্কিন বাণিজ্যিক সমঝোতায় ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছিল। এবার ভারতের সেই সাফল্যের একদম ‘কাঁধের কাছে’ পৌঁছে গেল বাংলাদেশ। এই চুক্তির ফলে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি বস্ত্র ও অন্যান্য পণ্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ক্ষমতা কয়েক গুণ বেড়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর বাংলাদেশের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন-এই চুক্তি দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়। এর ফলে আমেরিকা এবং বাংলাদেশের বাজারে উভয় পক্ষের পণ্যের অবাধ যাতায়াত আরও বাড়বে।
প্রসঙ্গত, ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় দফার ক্ষমতার শুরুতে বাংলাদেশের ওপর এক ধাক্কায় ৩৭ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েছিলেন, যা বাংলাদেশের বস্ত্র শিল্পের জন্য চরম সংকট তৈরি করেছিল। গত আগস্ট মাসে দীর্ঘ আলোচনার পর তা ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। এবার তা আরও ১ শতাংশ কমিয়ে ১৯-এ আনা হলো। শুধু তাই নয়, হোয়াইট হাউসের তরফে জানানো হয়েছে যে, বাংলাদেশের বেশ কিছু বস্ত্রজাত পণ্যকে আগামী দিনে সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত করা হবে। যদিও কোন কোন পণ্য এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত, তা এখনও গোপন রাখা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়লগ্নে এই কূটনৈতিক জয়কে ইউনূস প্রশাসনের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে দেখছে ওয়াকিবহাল মহল। এর ফলে ভারতের রফতানি বাণিজ্যে কিছুটা হলেও প্রতিযোগিতার চাপ বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।












Discussion about this post