শান্তির নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অবশেষে ১২ ফেব্রুয়ারি একটি সাজানো জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের আয়োজন করতে চলেছে। কার্যত অসাংবিধানিক উপায়ে একটি নির্বাচিত সরকারকে অপসারণ করে ক্ষমতা দখলের পর বিগত ১৯ মাসে মুহাম্মদ ইউনূস একদিকে যেমন নিজের ব্যক্তি স্বার্থসংশ্লিষ্ট সকল বিষয়গুলি সুরাহা করেছেন, তেমনই অন্যদিকে তাঁর নিয়োগকর্তাদের খুশি করতে করেছেন একের পর এক দেশবিরোধী চুক্তিও সম্পন্ন করেছেন। আবার কিছু চুক্তি বা কাজ সম্পন্ন করতে পারেননি বলেও জানা যাচ্ছে। তাঁর শাসনামলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি, প্রাকৃতিক সম্পদ, বন্দর-সহ গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য বিষয়ে ক্ষমতা কার্যত বিভিন্ন বিদেশি শক্তিগুলির হাতে তুলে দিয়েছেন নিজের অবৈধ ক্ষমতাবলে। আর ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে চলা একটি সাজানো নির্বাচনকে সামনে রেখেই তিনি তাঁর সকল রাষ্ট্রবিরোধী অপকর্মের বৈধতা দিয়ে যেতে চাইছেন। এমনটাই মনে করছে বাংলাদেশের রাডনৈতিক ও কূটনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের একটা বড় অংশ। ফলে বিগত আঠারো-উনিশ মাসে মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে একটা পর্যালোচনা করাও এখন জরুরি। আসুন একঝলকে দেখে নেওয়া যাক তিনি বাংলাদেশের জন্য ঠিক কি কি করেছেন।
প্রথমত, এই সরকারের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়েই একটা প্রশ্ন রয়েছে। কারণ বাংলাদেশের সংবিধানে কোনও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নির্দেশনা নেই। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিও এই বিষয়ে একবার আলোকপাত করেছিলেন। তবুও ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এক তথাকথিত গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকারকে উৎখাত করা এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতায় বসেছিলেন মুহাম্মদ ইউনূস। তারপর থেকেই তিনি কার্যত বাংলাদেশের ভাগ্যনিয়ন্ত্রা। অন্যদিকে আমরা দেখেছি, বাংলাদেশে ক্ষমতা দখলের পর পরই ইউনূসের সরকার সে দেশের সকল শীর্ষ সন্ত্রাসী ও জঙ্গীদের জেল থেকে মুক্তি দিয়ে দেশকে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে। এর পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ কার্যত মবের মূলুকে পরিণত হয়েছে। হত্যা, ধর্ষণ, মব সন্ত্রাস, চুরি ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি বাংলাদেশে কার্যত নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষও একসময় রাস্তায় বেরোতে ভয় পেতেন। তবে এটা বলাই যায়, বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনও খুব একটা উন্নতি হয়েছে, তা বলা যাবে না। বিগত দুই-তিন মাসে বাংলাদেশে বেশ কয়েকজন হিন্দু নাগরিকের খুন হওয়া এবং রাজনৈতিক হিংসায় বেশ কয়েকজন বিএনপি নেতা-কর্মীর খুন হওয়া নিয়ে শোরগোল হচ্ছে। অর্থাৎ, বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে আজও প্রশ্নচিহ্ন রয়ে গিয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা আজ খুব সঙ্গীন। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূসের এই সরকার বিগত ১৮ মাসে ঋণ করেছে ৪ লক্ষ কোটি টাকার বেশি। পাশাপাশি প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট ছাপানোর ফলে দেশের মূদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়েছে রেকর্ড পরিমাণে। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে কোনও বিদেশি বিনিয়োগ নেই, পাশাপাশি সে দেশের সবচেয়ে লাভদায়ক পোশাকশিল্পের কারখানাগুলি আজ ধুঁকছে। প্রায় ১৫০-র বেশি কারখানা আজ বন্ধ বা প্রায় বন্ধ। ফলে বেকার হয়েছে অন্ততপক্ষে ২০ লক্ষ মানুষ। মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশে একাধিক প্রকল্প বন্ধ হয়ে রয়েছে। ভারতের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে ভারতীয় বিনিয়োগগুলি স্থগিত করেছেন। ফলে বাংলাদেশের একাধিক রেল ও সড়ক প্রকল্প মাঝপথে থমকে আছে। এছাড়া শিল্পতালুক তৈরি এবং ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধাও এখন বিশ বাও জলে। ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন একেবারেই তলানিতে। ড. ইউনূস ক্ষমতায় এসেই বলেছিলেন, আমরা বিদেশে যাব না, বরং বিদেশিরাই আমাদের কাছে আসবে। সে বিষয়টি একমাত্র পরিলক্ষিত হতে দেখা যাচ্ছে। কারণ, ভারত-সহ বিশ্বের বহু দেশ এখন বাংলাদেশিদের ভিসা দিতে অস্বীকার করছে। বহু দেশ বাংলাদেশিদের ভিসা প্রদান স্থগিত কিংবা সীমিত করেছে। তরুণ প্রজন্মের যারা উচ্চ শিক্ষা কিংবা উন্নত জীবনের আশায় বিদেশ যাবার স্বপ্ন দেখতেন। তাঁরা আজ হা-হুতাশ করছেন। তবে বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা এখন বাংলাদেশে আসছেন বটে, তবে তা কেবলমাত্র নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে। মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে আপশ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে রাখাইন মানবিক করিডোর দিতে চেয়েছিলেন। সেন্ট মার্টিন দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক বেস করতে দিতে চেয়েছিলেন। চট্টগ্রামের নিউমরিং কন্টেনার টার্মিনালকে বিদেশী সংস্থার হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলেন। আরও অনেক কিছু তিনি করেছেন, যা বাংলাদেশের স্বার্থ বিরোধী।
এখন ইউনূস সরকার যাবে বলে যারা ধরে নিচ্ছেন, তাঁরা বোকা। কারণ, মুহাম্মদ ইউনূস জাতীয় নির্বাচনের সাথে যে গণভোটটা জুড়ে দিয়েছেন। এর মাধ্যমেই মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার কফিনে শেষ পেরেক টা ঠুকে দিতে চাইছেন। গণভোটে হ্যাঁ কে জয়ী করার মরণপন চেষ্টা চালিয়ে তিনি এই বিষয়ে একটা ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন। ফলে আরও ছয়মাস তিনি থাকছেন। জাতীয় নির্বাচনের ফল কবে ঘোষণা হবে, কে বা কারা জয়ী হবে সেটা নিয়ে ভেবে লাভ নেই। আপাতত গণভোট নিয়েই ভাবতে হবে। কারণ মুহাম্মদ ইউনূস চাইছেন গণভোটে হ্যাঁ জয়যুক্ত হোক। বাকি কাজটা তিনিই করবেন।












Discussion about this post