জটায়ু বেঁচে থাকলে নির্ঘাত বলতেন “গালগোটিয়াসের গ্যাঁড়াকল। পদ্মাপারে যা হল সেটা প্রায় তেমনই। হীরক রাজা দেশে ছবির গানের সুরে বলতে হয় “কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায় ও ভাইরে ও ভাই কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়।/ আমি যেই দিকেতে চাই /দেখে অবাক বনে যাই/আমি অর্থ কোনো খুজি নাহি পাইরে, /ও ভাই অর্থ কোনো খুজি নাহি পাইরে, /ভাই রে, ভাই রে আমি কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়।”
রঙ্গই বলা যেতে পারে। একটা তারিখ উল্লেখ করতে হয়। ২৪ মে, ২০২৫। দিনটি ছিল শনিবার। সরকারের নিরপেক্ষতা বজায় রাখার স্বার্থে বিতর্কিত উপদেষ্টাদের বাদ দিয়ে উপদেষ্টা পরিষদ পুনর্গঠনের দাবি জানায় বিএনপি। তারা দেখা করেছিল তদারকি সরকার প্রধান ইউনূসের সঙ্গে। বৈঠক শেষে যমুনার সামনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, “পদত্যাগের ব্যাপারে আমরা লিখিত বক্তব্য জানিয়েছি। আগেও জানিয়েছিলাম। নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান এবং দুইজন ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া এবং মাহফুজ আলমের জন্য এই সরকারের নিরাপত্তা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। তাদের বাদ দেওয়ার জন্য আজকেও লিখিত বক্তব্য দিয়েছি। মুখেও বলেছি।” এই বিষয়ে তাদের কোনও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে কি না – এমন প্রশ্নে এই বিএনপি নেতা বলেছিলেন, “আশ্বাস তাঁরা দেখবেন। আমরা আমাদের বক্তব্য দিয়েছি। ” এই বিএনপির তরফে এক সময় হ্যাশট্যাগ খলিল মাস্ট গো বলে প্রচার চালানো হয়।
এখানেই শেষ নয়। খুলনার সার্কিট হাউস ময়দানে এক সমাবেশে এই সালাহউদ্দিন আহমেদ প্রশ্ন তুলেছিলেন, “কী করে একজন বিদেশি নাগরিককে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা করা হল। ”তিনি অভিযোগ করেন, রোহিঙ্গা করিডোরের নামে দেশকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। সে সময়ের প্রেক্ষাপটে বিএনপির অবস্থান ছিল জাতীয় নিরাপত্তা কোনও “বিদেশির” হাতে থাকবে না।
প্রায় এক বছর বাদে বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে দৃশ্যপট পরিবর্তন। যার পদত্যাগের দাবিতে এই বিএনপিকে সোচ্চার হতে দেখা যায়, সেই খলিলুরকে বিএনপি মন্ত্রিসভায় জায়গা দেওয়া হয়েছে। ২০২৪-য়ের নভেম্বরে প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা সমস্যা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়াবলি সংক্রান্ত হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে নিয়োগ পান খলিলুর রহমান। পরের বছর এপ্রিলে তাঁকে প্রধান উপদেষ্টার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা করা হয়। আর সেখান থেকে সরাসরি তারেকের “রসুইখানা” ক্যাবিনেটে।
দলের তরফ থেকে বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিকমহলে খলিলুরের একটি নিজস্ব পরিচিতি আছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে ড. খলিল একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। লন্ডনে তারেক রহমানের সঙ্গে ইউনূসের বৈঠকের দৌত্য করেছিলেন এই খলিলুর রহমান। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়। সেই সময় তাঁকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে দেখা যায়। মার্কিন শুল্ক আরোপের প্রেক্ষাপটে যে পারস্পরিক বাণিজ্য সমঝোতা হয়, তার নেপথ্য কারিগর ছিল এই ডক্টর মশাই। একই সঙ্গে মায়ানমার ইস্যুতে কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা, আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সংলাপ অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ অবদান রয়েছে বলে মনে করছে তারেক রহমানের দল। দলের তরফে এটাও বলা হচ্ছে, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের সঙ্গে যোগাযোগ, কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা, বেজিংয়ে কুচকাওয়াজে অংশগ্রহণ – সব মিলিয়ে বহুমাত্রিক কূটনৈতিক তৎপরতায় তিনি সব সময় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। সেই সময় চিনের প্রেসিডেন্ট শি, রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন, উত্তর কোরিয়ার উন এবং পাক প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারির পাশে বাংলাদেশের হয়ে একমাত্র খলিলুর রহমানকেই দেখা গিয়েছিল। রাজনৈতিকমহল মনে করছে, এই সব সক্রিয় ভূমিকার স্বীকৃতি এবং প্রতিদান দিতেই খলিলুরকে তারেকের মন্ত্রিসভায় নেওয়া হয়েছে। এবং দেওয়া হয়েছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রক।












Discussion about this post