প্রধামন্ত্রী পদে তারেক রহমান শপথ নিয়েছেন এক সপ্তাহ আগে। শপথবাক্য পাঠ করান মুহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। আর সেই রাষ্ট্রপতি এক সাক্ষাৎকারে বিস্ফোরক দাবি করেছেন। বলেছেন, দেড়বছর তিনি কার্যত বঙ্গভবনে বন্দি ছিলেন। অসাংবিধানিক চাপ, অপসারণের চাপ, বিদেশ সফর আটকে দেওয়া, প্রেস উইং সরিয়ে নেওয়া, এমনকী ইদের নামাজে যেতেও বাধা। রাষ্ট্রপতির অভিযোগ অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান অবজ্ঞা করেছেন। সংবিধানের ১৪৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, বিদেশি চুক্তির রিপোর্ট দেওয়া হয়নি। সংবিধান লঙ্ঘনের ইঙ্গিত তিনি নিজেই দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন একটাই – সংবিধান রক্ষার শপথ নেওয়া রাষ্ট্রপতি তখন নিজে কী করছিলেন? তিনি বলছেন, আইনি জটিলতা আর ব্যুমেরাং হওয়ার ভয়ে নীরব ছিলেন। আবার তিনিই দাবি করছেন তাঁর দৃঢ়মনোবলের কারণে দেশ রক্ষা পেয়েছে। নীরব থেকেই কীভাবে দেশ রক্ষা হল? না কি এই নীরবতাই ছিল সংবিধান লঙ্ঘনের নীরব সম্মতি?
এখন পরিস্থিতি বদলেছে। যিনি তখন পাশে ছিলেন, সেই তারেক রহমান এখন প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্রপতি মুক্তভাবে কথা বলছেন। তাহলে এখন কী আসবে কোনও পদক্ষেপ? না কি বিস্ফোরক অভিযোগেই শেষ হবে সব? শপথ বনাম নীরবতা। রাষ্ট্রপতির দায় কোথায় শেষ? আর ইতিহাসের বিচার কোথা থেকে শুরু? মাত্র এক সপ্তাহ আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদে শপথ নিয়েছেন তারেক রহমান। তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। ২০২২ সালের রাষ্ট্রপতিকে শপথবাক্য পাঠ করান তৎকালীন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। রাষ্ট্রপতি পদে শপথ নেওয়ার সময় সাহাবুদ্দিন চুপ্প কী বলেছিলেন? আমি সশ্রদ্ধচিত্তে শপথ করিতেছি যে আমি আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদের কর্তব্য বিশ্বস্ততার সহিত পালন করিব। আমি বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণ করিব। আমি সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তাবিধান করিব। এবং আমি ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হইয়া সকলের প্রতি আইন অনুযায়ী যথাবিহীত আচরণ করিব।”
সম্প্রতি মহম্মদ সাহাবুদ্দিন বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সেই সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, গত দেড় বছর ধরে তিনি বঙ্গভবনে চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দি ছিলেন। অসাংবিধানিক চাপ, অপসারণের চক্রান্ত, প্রেস উইং খালি করে দেওয়া, বিদেশ সফর আটকে দেওয়া – এ সব তো ছিলই। এমনকী ইদের নমাজ পড়তে জাতীয় ইদগাহে যেতে দেওয়া হয়নি। বাইপাস সার্জারির পর ফলোআপের জন্য তাঁর সিঙ্গাপুর যাওয়ার কথা ছিল। তদারকি সরকার তাঁকে বিদেশ যাওয়ার ছাড়পত্র দিতে অস্বীকার করে। তিনি নিজে বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান মানেননি। বিদেশ সফরের রিপোর্ট দেননি। বিদেশি মিশন থেকে রাষ্ট্রপতির ছবি নামিয়ে ফেলেছে। এমনকী একজন প্রাক্তন এক বিচারপতিকে অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ দেওয়ারও চেষ্টা হয়। এর মধ্যে সব চেয়ে গুরুতর অভিযোগ হল সংবিধানের ১৪৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিদেশ থেকে ফিরে বিদেশি চুক্তি সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করা। যা কখনও করেননি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। সংবিধানের ৭ এবং ৭ (ক) অনুচ্ছেদ অনুসারে সংবিধান লঙ্ঘন মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ। রাষ্ট্রপতি নিজে এটা জানতেন তবুও তিনি কোনও আইনি বা সাংবিধানিক পদক্ষেপ করেননি। কারণ, তিনি বলেছেন আইনি জটিলতা ও ব্যুমেরাং হওয়ার ভয়ে। রাষ্ট্রপতি বলেছেন, এড়িয়ে গিয়েছি। চিন্তা করেছি যতটা নির্ঝঞ্ঝাট থাকা যায়। তাই, নীরবে সয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি।
রাষ্ট্রপতি শপথে সংবিধান রক্ষার কথা বলা হয়েছে। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব সংবিধান রক্ষা করা। যখন তিনি জানতে সংবিধান লঙ্ঘন করা হচ্ছে, তখন তিনি কেন পদক্ষেপ করেননি? অথচ রাষ্ট্রপতি নিজে একজন বিচারক। জেলা ও দায়রা আদালতে বিচারকার্য পরিচালনার অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে। একজন আইন ও বিচারের মানুষ হয়ে এই নীরবতা কি তাঁর নিজের দায়িত্বপালনে ব্যর্থতা? না কি বাস্তবতার কাছে আত্মসমর্পণ? রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদের কথা বলেছেন। সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, সংবিধান লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বা উস্কানি বা অনুমোদন বা সমর্থন বা অনুসমর্থন করলেও একই শাস্তি হবে। রাষ্ট্রপতির ক্ষেত্রে এই সব অভিযোগের কোনওটি কি প্রযোজ্য হয়।












Discussion about this post