রাষ্ট্রপতি মহম্মদ সাহাবুদ্দিন গণমাধ্যমে যে সব কথা বলেছেন, সেটা তাঁর শপথভঙ্গের সামিল। তাঁর দায়িত্ব ছিল সকল ভয়ভীতির উর্ধ্বে উঠে সংবিধান সমুন্নত রাখা। কিন্তু তিনি তা রাখতে পারেননি। তাই, সংসদের প্রথম অধিবেশনে তাঁর বিরুদ্ধে অভিশংসনের প্রস্তাব আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মূলত বিরোধী শিবির। রাষ্ট্রপতিকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দিতে হবে – এই দাবি অনেকদিনের। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এই দাবি উঠেছিল ছাত্র জনতার পক্ষ থেকে। বিএনপির একটি অংশ এই প্রস্তাব সমর্থন করে। তবে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব, অর্থাৎ তারেক রহমানের আপোষহীন অবস্থানের কারণেই রাষ্ট্রপতি তাঁর পদে বহাল ছিলেন। কিন্তু আকষ্মিকভাবেই রাষ্ট্রপতি চুপ্পু রয়টার্সকে জানান, নির্বাচনের পরেই তিনি পদত্যাগ করবেন। এই কারণে নির্বাচনের পর আলোচনা শুরু হয় পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন? রাষ্ট্রপতি এখন অবশ্য জানাচ্ছেন, সেই সময় মনে দুঃখ পেয়ে তিনি ওই সব কথা বলেছিলেন। এখন তিনি আর পদত্যাগ করতে চাইছেন না। বিএনপি যদি তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে তিনি থেকে যাবেন। আর বিএনপি তাদের পছন্দমতো কাউকে রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ করলে তিনি চলে যাবেন। অর্থাৎ, রাষ্ট্রপতিপদে থেকে তিনি বিএনপির উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত করতে চাইছেন। কী সেই উদ্দেশ্য? কেনই বা রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু আওয়ামী লীগার হয়েও বিএনপির সেবা করতে চান? অনেক প্রশ্ন। তাই হিসেবও অনেক।
প্রথমেই মনে করিয়ে দেওয়া যাক রাষ্ট্রপতি ছাত্রজীবনে করতেন ছাত্র লীগ। তিনি পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। ছাত্রাবস্থাতেই তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধের পর পড়াশোনা শেষ করে সাহাবুদ্দিন চুপ্পু প্রথমে কয়েকবছর সাংবাদিকতা করেন। এরপরে যোগ দেন সিভিল সার্ভিসে। বিচার ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে জেলা দায়রা জজ হিসেবে তাঁর কর্মজীবনের প্রথম পর্যায় শেষ হয়। পরবর্তীকালে তিনি পাঁচ বছর কাজ করে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার হিসেবে। ২০২৩ সালে দায়িত্ব নেন বাংলাশের রাষ্ট্রপতির। সে সময় তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার ও প্রকাশনা উপকমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০২৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী হিসেবে তাঁর মনোনয়নপত্র নির্বাচন কমিশনে জমা দেন ওবাইদুল কাদির, জাহাঙ্গির কবির নানক ও লিটন চৌধুরি। আইনের দিকে থেকে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। কিন্তু তিনি আওয়ামী লীগের মনোনিত। তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাও বটে। আইনগতভাবে রাষ্ট্রপতি পদে সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর বহাল থাকার ক্ষেত্রে কোনও বাধা নেই। কিন্তু নীতি নৈতিককতার নিরিখে তাঁর অবস্থান কিছুটা দূর্বল করে দেয়। এই দূর্বল অবস্থান নিয়েই রাষ্ট্রপতি থেকে যেতে চান। সাহাবুদ্দিন চুপ্পু গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বিএনপি চাইলে তিনি থাকবেন। অর্থাৎ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু এখন বিএনপিকে সার্ভ করতে চাইছেন। কিন্তু তিনি কি আসলে বিএনপিক সার্ভ করতে পারবেন? কারণ এই বিএনপিই তো ২০০১ থেকে পরবর্তী পাঁচ বছর বিএনপি সরকারের দুর্নীতি, সন্ত্রাস অনুসন্ধান কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। সেই কমিটি বিএনপি নেতাদের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছিল। এমনকী এর জন্য গেজেট প্রকাশ করা হয়েছিল। এখন তাহলে কীভাবে বিএনপির উপকার করবেন?
বড়ো উপকারটি তিনি এর মধ্যে করে ফেলেছেন। তা হল নির্বাচন আয়োজন। রাষ্ট্রপতি একাধিকবার বলেছেন, পদে থাকার সময় তাকে বার বার সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলে। তিনি সরে গেলে নির্বাচন অনিশ্চিত হয়ে পড়ত। বিএনপি চেয়ারম্যানের আপোষহীন মনোভাবের কারণে তিনি তাঁর পদে বহাল থাকতে পেরেছেন। এদিকে নির্বাচন যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। এই দলের কাছে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর দ্বিতীয় ঋণ হল অধ্যাদেশ বাতিল করা। ড. ইউনূস দেড় বছরে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেন। রাষ্ট্রপতি এই সব অধ্যাদেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। তিনি বলেছেন, ওই সব অধ্যাদেশ যথাযথ প্রক্রিয়ায় জারি করা হয়নি। এর মধ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন অধ্যাদেশ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই আদশে এমন কিছু রয়েছে, যা বিএনপি সরকারকে মানতে বাধ্য করবে। বিএনপি চায়, রাষ্ট্রপতি ওই সব অধ্যাদেশ বাতিল করুক। এগুলি বাতিল হলে তারেক রহমান সরকার বিরাট রকম স্বস্তিতে থাকবে।












Discussion about this post