দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে বহুল আলোচিত ‘জুলাই সনদ’ ও তা ঘিরে অনুষ্ঠিত গণভোট এখন অনিশ্চয়তার মুখে। উচ্চ আদালতের এক নির্দেশনার পর এই দুটি বিষয় বাতিলের পথে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যাচ্ছে। আদালত প্রাথমিক শুনানিতে সনদের সাংবিধানিক বৈধতা ও গণভোটের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। নির্বাচনের আগে বহু মহলের ব্যক্তিত্ব বলেছিলেন, যে রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে সংবিধান বিরোধী অধ্যাদেশ দেওয়ার যে প্রক্রিয়ায় ইউনূস সরকার এগোচ্ছে, এগুলি কোনওটাই টিকবে না। আদালতে চ্যালেঞ্জ হলে ধাক্কা খেতে পারে জুলাই সনদ ও গণভোট। এখন মনে হচ্ছে, সেই দিকেই এগোচ্ছে। জুলাই সনদ ও গণভোটের বিরুদ্ধে যে রিট হয়েছিল, সেই রিটের আদেশে আদালত যে অবস্থান নিয়েছে এবং রিটের আদেশে রুল জরি করেছেন যে এটা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, এই রুল জারির মাধ্যমেই একটা বার্তা আদালত থেকে এল। সংবিধান বিরোধী যে কোনও কাজ আদালত পর্যন্ত গেলে, সেটা বাতিল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গত জুলাই মাসে সরকার ঘোষিত ‘জুলাই সনদ’-এ প্রশাসনিক সংস্কার, নির্বাচন পদ্ধতিতে পরিবর্তন এবং কিছু মৌলিক নীতিগত সংশোধনের প্রস্তাব ছিল। সরকারের দাবি ছিল, এটি রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াবে। তবে বিরোধী দল ও বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন শুরু থেকেই অভিযোগ করে আসছিল যে, সংবিধান সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যথাযথ সংসদীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।
এরই মধ্যে কয়েকদিন আগে আয়োজিত গণভোটে সরকারপন্থীরা সনদের পক্ষে জনসমর্থন পাওয়ার দাবি করে। নির্বাচন কমিশন প্রাথমিকভাবে জানায়, অংশগ্রহণ সন্তোষজনক ছিল এবং অধিকাংশ ভোটার সনদের পক্ষে মত দিয়েছেন। কিন্তু বিরোধীরা ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, প্রশাসনিক প্রভাব এবং পর্যবেক্ষকের অভাবের অভিযোগ তোলে।
এই প্রেক্ষাপটে একাধিক রিট আবেদনের শুনানি শেষে আদালত অন্তর্বর্তী আদেশে গণভোটের ফলাফল প্রকাশ ও বাস্তবায়নে স্থগিতাদেশ দেন। আদালত থেকে রুল জারি করা হয়েছে। আদালতের তরফে চারটি রুল জারি করা হয়েছে। একই সঙ্গে জুলাই সনদের কয়েকটি ধারা কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করা হয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, “সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ আবশ্যক।”
বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। সরকার বলছে, তারা আদালতের নির্দেশ মেনে চলবে এবং আইনি লড়াই চালিয়ে যাবে। অন্যদিকে বিরোধীরা এটিকে “গণতন্ত্র রক্ষার প্রথম ধাপ” হিসেবে দেখছে এবং দ্রুত সনদ পুরোপুরি বাতিলের দাবি জানাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, আদালতের চূড়ান্ত রায় দেশের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। জুলাই সনদ ও গণভোট ঘিরে তৈরি হওয়া এই বিতর্ক বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। এখন সবার নজর আদালতের পরবর্তী শুনানি ও সরকারের পদক্ষেপের দিকে। এদিকে জামায়াতের আইনজীবী শিশির মনির যখন এই বিষয়ে গনমাধ্যমে কথা বলেন, তাকেও হতাশ মনে হয়েছে। তিনি এই কথা বলেছেন, যে সরকার নিজেই ইচ্ছে করে এগুলিকে প্রভাবিত করছে এবং রাজনৈতিক বিষয়গুলি আদালতে নিয়ে এসে একটি জটিল পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে। এমনকি জামায়েত বলেছে, কে সরকারের তরফে জুলাই সনদ ও গণভোট নিয়ে দ্বিচারিতা করা হচ্ছে। এনসিপির তরফে বলা হয়েছে, দুই দিক দিয়ে খেলছে সরকার। বাংলাদেশের সংবিধানে ৯৩ অনুচ্ছেদে বলা রয়েছে, রাষ্ট্রপতিকে অধিকার দেওয়া হয়েছে উদ্ধার দেশ জারির। কিন্তু ওই অনুচ্ছেদেই বলা রয়েছে, রাষ্ট্রপতি কোনও সংবিধান বিরোধী আদেশ দিতে পারবেন না। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে যে অধ্যাদেশ জারি করিয়েছে ইউনূস সরকার, সেগুলো সংবিধান বিরোধী। অনেকেই বলছেন, শুধুমাত্র জুলাই সনদ বা গণভোট নয়। অনেক ক্ষেত্রেই সংবিধান বিরোধী কাজ করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। যেগুলি আদালতে চ্যালেঞ্জ হবে এবং বাতিল হবে। ফলে পরিস্থিতি বাংলাদেশে আরও জটিল হতে যাচ্ছে, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এখন দেখার, শেষমেশ কি পরিস্থিতি তৈরি হয়।












Discussion about this post