একটা চুক্তি। আর সেই চুক্তিকে কেন্দ্র করে পদ্মায় তৈরি হয়েছে গভীর নিম্নচাপ। এই চুক্তি হয়েছিল পূর্বতন তদারকি সরকার প্রধান ইউনূসের আমলে, আমেরিকার সঙ্গে। নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির শিরোনাম “অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড।” তদারকি সরকারের তরফে জোর গলায় বলা হচ্ছিল এটা একটি ঐতিহাসিক চুক্তি। ভাবখানা এমন যে এমন চুক্তি ইতিহাসে আর দ্বিতীয়টি নেই। ইউনূস যখন ক্ষমতায়, সেই সময় আর একটি ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়। বলা হয়, এই চুক্তি প্রকাশ না করার স্বার্থেই সই করা হয়েছে। তখন থেকে একটা গুঞ্জন তৈরি হয়, চুক্তিতে কী এমন রয়েছে, যেটা প্রকাশ করা যাবে না? তদারকি সরকারও ক্ষমতা নেই, ইউনূসও ক্ষমতায় নেই। ফলে, এখন চুক্তির শর্ত প্রকাশিত হয়েছে। আর তাতে দেখা যাচ্ছে চুক্তিতে বাংলাদেশ ফেঁসে গিয়েছে।
সমালোচেকরা চুক্তির বিশ কিছু অংশ বাধ্যতামূলক ও শর্তযুক্ত ধারার দিকে আঙুল তুলেছেন। এই সব ধারা অনুযায়ী, আমেরিকা যে কোনও সময় চুক্তি বাতিল করে পুরনো শুল্ক হার ফিরিয়ে আনার ক্ষমতা রাখে। উদহারণ হিসেবে ডিজিটাল বাণিজ্যসংক্রান্ত ধারাটির কথা বলা যেতে পারে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যদি অন্য কোনো দেশের সঙ্গে ডিজিটাল বাণিজ্য চুক্তি করে এবং তা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে, তবে ওয়াশিংটন এই চুক্তি বাতিল করতে পারবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশি পণ্যে আবারও ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করতে পারবে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র এই শুল্কহার প্রস্তাব করেছিল।
এই শর্ত প্রযোজ্য হবে যদি বাংলাদেশে এমন কোনও দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য বা অগ্রাধিকারমুলক চুক্তি করে যাকে যুক্তরাষ্ট্র ‘নন-মার্কেট কান্ট্রি’ বা বাজার অর্থনীতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না।চুক্তিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনায় সমাধান না হলে ওয়াশিংটন চুক্তি থেকে বেরিয়ে যেতে পারবে এবং পুনরায় ৩৭ শতাংশ শুল্ক বহাল করতে পারবে। এই উচ্চ হারে শুল্ক আরোপ হলে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি বড় ধরনের ধাক্কা খাবে। কারণ, তৈরি পোশাক ও অন্যান্য পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ যে আয় করে, তার প্রায় এক-পঞ্চমাংশই আসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে। গত ৯ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকার ও ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এতে এমন একটি ধারাও রয়েছে, যা বাংলাদেশকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্নকারী’ কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি, জ্বালানি রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কেনায় বাধা দেবে।তবে একটি ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। বলা হয়েছে, যদি বিকল্প কোনো সরবরাহকারী বা প্রযুক্তি না থাকে অথবা চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগেই বিদ্যমান চুল্লির জন্য উপকরণ কেনার চুক্তি হয়ে থাকে, তবে তা এই নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত থাকবে।
এর মানে হলো, রাশিয়ার প্রযুক্তি ও আর্থিক সহায়তায় নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত থাকতে পারে। তবে ভবিষ্যতের কোনো পারমাণবিক প্রকল্পের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নজর থাকবে। অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত ধারাটি উদ্ধৃত করে ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ ফেসবুকে লিখেছেন, ‘এটি চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত অংশ, কারণ এখানে “সার্বভৌমত্ব” নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।’ ওই ধারায় আরও বলা হয়েছে, ‘যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা বাণিজ্য সহজতর ও উন্নত করতে কাজ করবে।’ পারমাণবিক বিধিনিষেধের বিষয়ে আসিফ সালেহ বলেন, ‘এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।’ চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সরাসরি বিনিয়োগের দুয়ারও খোলা রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে তারা খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান, খনন, উত্তোলন, পরিশোধন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, বিতরণ ও রপ্তানি করতে পারবে। এ ছাড়া বাংলাদেশকে সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের মার্কিন কৃষিপণ্য কিনতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে পাঁচ বছর ধরে প্রতিবছর অন্তত ৭ লাখ টন গম এবং অন্তত ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার বা ২৬ লাখ টন সয়া ও সয়াজাত পণ্য এবং তুলা।পাশাপাশি বাংলাদেশকে প্রাথমিকভাবে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনতে হবে। এ ছাড়া আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু দেশের কাছ থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার ওপরও সীমা আরোপ করা হয়েছে।












Discussion about this post