কোনও দল ক্ষমতায় থাকলে দলের কেউ কেউ দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। রাজনীতিতে এটা সাধারণ ঘটনা। দল ক্ষমতায় যত বেশিদিন টিকে থাকবে, ততই দুর্নীতির জালে জড়িয়ে পড়বে। তদারকি সরকার বাংলাদেশে ক্ষমতায় ছিল মাত্র দেড় মাস। এই দেড় মাসের সেই সরকারের উপদেষ্টাদের অনেকে যে পরিমাণ দুর্নীতিতে জড়িয়ে গিয়েছে, তা পাহাড়প্রমাণ বললে কম বলা হবে। তবে সবাইকে ছাপিয়ে বেনজির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে আসিফ মাহমুদ। তিনি কিন্তু বাংলাদেশের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি। বলা ভালো, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কোনও সুযোগ তাঁর ছিল না। বিএনপি, জামায়াত, গণঅধিকার পরিষদ কেউ তাঁকে টিকিট দিতে রাজি হয়নি। কারণ একটাই- পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি। কিন্তু এনসিপি দিতেই পারত। শোনা যাচ্ছে দলের তরফে তাকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য টিকিট দেওয়া হয়েছিল। আসিফ মাহমুদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার সিদ্ধান্ত নেন। পরিবর্তে তিনি দলের মুখপাত্র হন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে নীরব সিদ্ধান্ত থেকে। নির্বাচন না করা, মনোনয়নপত্র জমা না দেওয়া, শেষ মুহূর্তে সড়ে দাঁড়ানো – এসব কিছু ব্যক্তিগত কৌশল নয়। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভিতরে জমে থাকা চাপের ফল। নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে সব থেকে কঠিন এবং এড়ানোর অসম্ভব শর্ত হল সম্পদের হলফনামা। এটা সব দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। বাংলাদেশে ত্রয়োদশ নির্বাচনে বেশ কয়েকজন প্রার্থীর জমা দেওয়া হলফনামা থেকে স্পষ্ট যে এই দেড় বছরের তাদের আঙুল ফুলে কলাগাছ নয়, বটগাছে রূপান্তরিত হয়েছে। গত দেড় বছরে তারা এতো টাকা আয় করেছে। একসময় যাতের চা খাওয়ার পয়সা জুটত না, এখন তাদের অনেকেই গুলশানের ফ্ল্যাটে থাকে।
এই টাকা তারা পেল কীভাবে? কে দিল তাদের এই টাকা? আর টাকা দেওয়ার বিনিময়ে “ দাতারা” প্রতিদানেই বা কী পেয়েছেন ? এই টাকাটা বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহু প্রভাবশালী মানুষের জন্য অস্বস্তিকর। কারণ, ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে সম্পদের যে ভয়াবহ উল্লম্ফন ঘটেছে, তা কাগজে ধরিয়ে দেওয়া সহজ নয়। বিশেষ করে সেই সম্পদের উৎস প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নিয়োগ বা টেন্ডারবাজির সঙ্গে যুক্ত। আসিফ মাহমুদের ক্ষেত্রে বিতর্কটি ঘনীভূত হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে একটি ঘটনার উল্লেখ করতে হয়। গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের এক উপদেষ্টার প্রেস সেক্রেটারির অডিও ফাঁস হয়। অডি ফাঁস করেন সাংবাদিক জাওয়াদ নির্ঝর। ফাঁস হওয়া ওই অডিওতে তাকে টেন্ডারের কমিশন নিয়ে এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে শোনা যায়। সাংবাদিকের দাবি, কথোপকথনটি অন্তর্বর্তী সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার প্রেস সেক্রেটারি মাহফুজ আলমের। ফাঁস হওয়া অডিওতে মাহফুজ আলমকে এক ব্যক্তির সঙ্গে টেন্ডার নিয়ে কথা বলতে শোনা যায়। কথার এক পর্যায়ে ফোনের অপর প্রান্তে থাকা ব্যক্তি তিন শতাংশ কমিশন দেওয়ার কথা বলেন। তখন মাহফুজ বলেন, কাজ কনফার্ম করে দিলে তিন পার্সেন্ট। এখন কিছু কাজ চলছে, সেগুলি আমি সিক্স পার্সেন্ট করেছি। আপনি খোঁজ নেন। ওয়ান পার্সেন্ট মিডল ম্যান এবং ফাইভ পার্সেন্ট মিনিস্ট্রির জন্য।
আসিফ মাহমুদকে ক্রীডা উপদেষ্টা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা চালায় তদারকি সরকার। অর্থাৎ তাঁর কাজ মাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বাস্তবে তিনি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। যেখানে হাজার হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয়, সেই সব জায়গায় তাঁর প্রভাব ছিল দৃশ্যমান। কোন ফাইলে কে সই করেছে, সব জানা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসিফ মাহমুদের কেন্দ্র ছিল ঢাকা ১০। এই কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গেলে দরকার অর্থ। এক বছর আগেও যার পকেট ছিল গড়ের মাঠ, সে কী করে ওই রকম একটি কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সাহস পেলেন? তদারকি সরকার বিদায় নেওয়ার পর এখন সেই সব কুকীর্তি একে একে ফাঁস হচ্ছে।












Discussion about this post