ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান বন্ধে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে পেশ করা একটি যুদ্ধ ক্ষমতা প্রস্তাব সংকুচিত ভোটে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) অনুষ্ঠিত এই ভোটাভুটিতে ২১৯-২১২ ব্যবধানে প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যায়, যা মূলত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একতরফা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতাকে আরও সুসংহত করল। হাউসে রিপাবলিকানদের সংকীর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় এই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপটি ব্যর্থ হয়, যার ফলে ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো নতুন আক্রমণের জন্য প্রেসিডেন্টের এখন আর কংগ্রেসের আগাম অনুমোদনের প্রয়োজন পড়বে না। খবর আল জাজিরার।
এর আগেও একবার ভোটাভুটি হয়েছিল। সর্বশেষ এই ‘ওয়ার পাওয়ার্স রেজল্যুশন’ বা যুদ্ধ-সংক্রান্ত প্রস্তাবের পক্ষে ভোট পড়েছে ৪৭টি। বিপক্ষে ৫২টি। তাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রীতিমতো উচ্ছ্বসিত। সিনেটের আইনপ্রণেতারা সারা দিন ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপ অনুমোদন বা বন্ধ করার বিষয়ে কংগ্রেসের ক্ষমতা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্ক করেন। প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থকেরা বলছেন, ইসরায়েলের পাশাপাশি যুদ্ধ শুরু করে ট্রাম্প তার সাংবিধানিক ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। মার্কিন সংবিধানের ২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টরা কেবল তাৎক্ষণিক হুমকির মুখে আত্মরক্ষার্থেই এ ধরনের হামলা চালাতে পারেন। অন্যথায় যুদ্ধ ঘোষণার একক ক্ষমতা কেবল কংগ্রেসের। সেনেট সদস্য টিম কেইন তাঁর ভাষণে বলেন, “এমনকী গোপন বৈঠকেও ট্রাম্প প্রশাসন কোনও প্রমাণ দিতে পারেনি যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের থেকে আসন্ন কোনও হামলার হুমকির মুখে ছিল।” মার্কিন প্রেসিডেন্টের উদ্দেশ্যে তাঁর বার্তা “আপনি দাঁড়িয়ে বলতে পারেন না যে এটি একটি সামান্য ঘটনা, যা যুদ্ধের পর্যায়ে পড়ে না। আপনি এও বলতে পারেন না যে এটি একবারই ঘটেছে এবং ইরানের বিরুদ্ধে শত্রুতায় কোনও সৈন্য নিয়োজিত নেই। ” তবে বেশ কয়েকজন রিপাব্লিকান সদস্যের মতে, এই যুদ্ধের প্রয়োজন ছিল। তাঁদের যুক্তি, ৪৭ বছর ধরে ইরানের হুমকি প্রদর্শনই প্রেসিডেন্টের এই সামরিক পদক্ষেপকে বৈধতা দেয়। সিনেটর জেমস রিশের মতে, সংবিধান ‘প্রেসিডেন্টকে শুধু অধিকারই দেয় না, বরং যুক্তরাষ্ট্রকে রক্ষা করার জন্য তাঁকে শপথের মাধ্যমে কর্তব্যও অর্পণ করেছে।’
হাউস ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট গ্রেগরি মিকস এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো রাজা নন। যদি তিনি মনে করেন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ আমাদের জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজন, তবে তাকে কংগ্রেসে এসে তার সপক্ষে যুক্তি দিতে হবে।’ অন্যদিকে, রিপাবলিকান প্রতিনিধি ব্রায়ান মাস্ট এই পদক্ষেপের প্রশংসা করে জানান, ট্রাম্প দেশকে বড় ধরনের বিপদ থেকে রক্ষা করছেন।সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে প্রস্তাবের পক্ষে-বিপক্ষে ভোটের ব্যবধান যতই কম হোক, ইরানে হামলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পকে আর কখনো আইনি ঝামেলায় পড়তে হবে না। আরেকটি বিষয়ও নেমে গেল ট্রাম্পের কাঁধ থেকে। ডেমোক্র্যাটরা বলছিলেন, ইসরায়েলের জন্য ইরান যুদ্ধে নেমেছেন ট্রাম্প। সেই অভিযোগ শুনতে হলেও আইনিভাবে দায়মুক্তি পাবেন তিনি। সংখ্যার মারপ্যাঁচে ট্রাম্প আইনি বৈধতা পেলেও যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের এই ইস্যুতে রায় নেই। আন্তর্জাতিক সব জরিপ সংস্থার ফলাফলে দেখে গেছে, প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মার্কিনি ট্রাম্পের ইরান হামলার বিরোধিতা করেছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রস্তাবটি সিনেট এবং প্রতিনিধি পরিষদে (হাউস) পাস হলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এতে ‘ভেটো’ দেওয়ার ক্ষমতা রাখতেন। আর সেই ভেটো অগ্রাহ্য করতে উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন হতো, যা অর্জন করা বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রায় অসম্ভব। ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর ১৯৭৩ সালে পাস হওয়া ‘ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট’-এর অধীনে এই প্রস্তাবটি আনা হয়েছিল। এই আইন অনুযায়ী, কংগ্রেস কোনও সামরিক অভিযানের বিষয়ে ভোটাভুটির আয়োজন করতে পারে এবং অনুমোদনহীন যুদ্ধের সময়সীমা ৬০ দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা স্বীকার করেছেন যে, এই প্রস্তাব পাসের সম্ভাবনা কম ছিল। তবে তাদের মতে, যুদ্ধের বিষয়ে আইনপ্রণেতারা জনসম্মুখে কী অবস্থান নিচ্ছেন, তা স্পষ্ট করার জন্যই এই ভোটাভুটি জরুরি ছিল।
প্রশ্ন হচ্ছে ট্রাম্পের পরের টার্গেট কোন দেশ? ট্রাম্পের নিশানায় মেক্সিকো, গ্রীনল্যান্ড এবং কিউবা।












Discussion about this post