“তোমাদের যা কিছু আছে, তা নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা। ” জলদগম্ভীর কণ্ঠে এই কথাগুলি উচ্চারণ করেছিলেন শেখ মুজিবর রহমান। দেশ আজ স্বাধীন হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশ একাধিক ঘটনাপ্রবাহের সাক্ষী। সেই সব ঘটনাপ্রবাহ মুজিবের জলদগম্ভীর কণ্ঠে উচ্চারিত হওয়া সেই স্বাধীনতার ঘোষণাকে ম্লান করতে পারেনি।
আরও একজনের উক্তির উল্লেখ করতে হয়। তিনি লিখেছিলেন, “৭ মার্চ, রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘোষণা আমাদের কাছে গ্রিন সিগন্যাল মনে হল। আমরা আমাদের পরিকল্পনাকে চুড়ান্ত রূপ দিলাম। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারির শেষে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিস্ফোরণ্মুক হয়ে উঠলে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীতে থাকা বাঙালি কর্মকর্তারাও তাঁর আঁচ পেতে থাকেন। ভিতরে ভিতরে আলোচনা চলতে থাকে। ” এই লেখার শিরোনাম ছিল “একটি জাতির জন্ম।” লিখেছিলেন জিয়াউর রহমান। মুক্তিযুদ্ধের একটি সেক্টরের কম্যান্ডার ছিলেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। প্রশ্ন, তারেক রহমান সরকার বিষয়টিকে কীভাবে দেখবে? শুক্রবার পর্যন্ত সরকারের তরফে এই ঐতিহাসিক দিন নিয়ে কোনও কর্মসূচির কথা ঘোষণা করে হয়নি। আর পূর্বতন তদারকি সরকার ঐতিহাসিক দিনে ছুটি বাতিল করেন। শনিবার বাংলাদেশে জাতীয় ছুটি। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছুটির দিনে অফিস করেছেন।
বিএনপি ৭ মার্চকে কোনওদিন সেভাবেব গুরুত্ব দেয়নি। ব্যক্তিগতভাবে দলের অনেকে বঙ্গবন্ধুর অবদানকে স্বীকার করে। তবে দলগতভাবে নয়। এমনকী মুজিবরকে তাঁর যোগ্য সম্মান দেয়নি। আবার আওয়ামী লীগ জিয়াউর রহমানকে মান্যতা দেয় না। স্বাধীনতার যুদ্ধে তাঁর যে অবদান রয়েছে, সেই অবদানকেও না। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা যে স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনে যে দুইজনের অবদান রয়েছে, রাজনৈতিক জাঁতাকলে আজ তাঁরা পিষ্ট।
এবারের একাত্তরের যে দিনটিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বজ্রকণ্ঠের ঘোষণায় স্বাধীনতার বার্তা ছড়িয়ে পড়েছিল দেশের প্রতিটি প্রান্তে, ইতিহাসের বাঁক বদলে দেওয়া সেই ৭ মার্চ এবার এসেছে ভিন্ন বাস্তবতায়। আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে ৭ মার্চ উদযাপনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসে যে ছেদ পড়ছিল, বিএনপির নতুন সরকারেও তা কাটেনি। বঙ্গবন্ধু কন্যা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রবল গণ আন্দোলনের মুখে চব্বিশের ৫ অগাস্ট দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যাওয়ার পর থেকে ইতিহাসে সবচেয়ে কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে আওয়ামী লীগ। হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনকালে প্রতিবছরই নানা কর্মসূচিতে পালিত হত জাতীয় দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া দিনটি। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার ৭ মার্চসহ আটটি জাতীয় দিবস বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। বদলে যাওয়া বাস্তবতায় ঐতিহাসিক এই দিনে কোনো কর্মসূচির কথা শোনা যায়নি। গতবছর মে মাসে আওয়ামী লীগের সব ধরনের কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে অন্তর্বর্তী সরকার। দলটির নেতাকর্মীরা হয় পলাতক, নয়ত জেলে। ক্ষমতা হারানোর পর থেকে আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মকাণ্ড ফেইসবুকেই সীমাবদ্ধ; ৭ মার্চ ঘিরেও এর ব্যতিক্রম দেখা যায়নি।
জাতির মুক্তি সংগ্রামের স্বপ্নে ধারাবাহিক আন্দোলনের এক পর্যায়ে ৫৫ বছর আগের এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ভাষণে স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দিয়ে যান। তৎকালীন রেস কোর্সের (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসমুদ্রে ২৩ বছরের বঞ্চনার ইতিহাস ১৯ মিনিটে তুলে ধরে সেদিন বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” এরপর ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ শুরু করলে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তানি শোষক, দখলদার ও তাদের এদেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর আসে স্বাধীনতা। সাতই মার্চের ভাষণের গুরুত্ব বিবেচনায় জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেস্কো এ ভাষণকে ‘ওয়ার্ল্ড ডকুমেন্টারি হেরিটেজের’ মর্যাদা দিয়েছে।












Discussion about this post