একেবারে ভিন্ন পরিবেশে এবার বাংলাদেশে পালিত হল ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। পদ্মাপারে পালাবদলের পর বেশ কয়েকটি প্রশ্ন ঘোরাঘুরি করছিল। সেই সব প্রশ্নের মধ্যে একটি ছিল দেশে আদৌ গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে আসবে? গত দেড় বছরে যে অরাজকতার মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশবাসী দিন যাপন করছিলেন, তার কি অবসান ঘটবে? না কি জামায়াত ক্ষমতা দখল করে দেশে মৌলবাদী শাসন ফিরিয়ে আনবে? বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে। বাংলাদেশে চলতে শুরু করেছে গণতন্ত্রের রেলগাড়ি। তারেক রহমান ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর দ্বিতীয় যে প্রশ্নটা নিয়ে চর্চা শুরু হয়, তা হল ঐতিহাসিক ৭ মার্চ এবছর কীভাবে পালিত হবে?
আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে ৭ মার্চ উদযাপনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসে যে ছেদ পড়ছিল, বিএনপির নতুন সরকারেও তা কাটেনি। বঙ্গবন্ধু কন্যা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রবল গণ আন্দোলনের মুখে চব্বিশের ৫ অগাস্ট দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যাওয়ার পর থেকে ইতিহাসে সবচেয়ে কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে আওয়ামী লীগ। হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে প্রতিবছর নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হত জাতীয় শহিদ দিবস। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার ৭ মার্চসহ আটটি জাতীয় দিবস বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। বদলে যাওয়া বাস্তবতায় ঐতিহাসিক এই দিনে কোনো কর্মসূচির কথা শোনা যায়নি। গতবছর মে মাসে আওয়ামী লীগের সব ধরনের কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে অন্তর্বর্তী সরকার। দলটির নেতাকর্মীরা হয় পলাতক, নয়ত জেলে। ক্ষমতা হারানোর পর থেকে আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মকাণ্ড ফেইসবুকেই সীমাবদ্ধ; ৭ মার্চ ঘিরেও এর ব্যতিক্রম দেখা যায়নি। জাতির মুক্তি সংগ্রামের স্বপ্নে ধারাবাহিক আন্দোলনের এক পর্যায়ে ৫৫ বছর আগের এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ভাষণে স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দিয়ে যান। তৎকালীন রেস কোর্সের (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসমুদ্রে ২৩ বছরের বঞ্চনার ইতিহাস ১৯ মিনিটে তুলে ধরে সেদিন বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” এরপর ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ শুরু করলে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তানি শোষক, দখলদার ও তাদের এদেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর আসে স্বাধীনতা।
এবছর ভিন্ন আঙ্গিকে পালিত হয়েছে ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। একটা বিষয় স্পষ্ট যে বিএনপি সরকারে আসায় মুক্তিযুদ্ধের কথা বলা সম্ভব হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর কথা মানুষ বলতে পারছে। গোপনে নয়, প্রকাশ্যেই তারা বঙ্গবন্ধুর নামে জয়ধ্বনিও দিচ্ছে। তবে কোনও কোনও প্রান্ত থেকে বিক্ষিপ্ত ঘটনার খবর পাওয়া গিয়েছে। রাজধানীর চানখাঁরপুল মোড়ে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক সাত মার্চের ভাষণ সাউন্ড বক্সে বাজানোয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন এক ছাত্রলীগ নেতা সহ দুজনকে আটক করেছে শাহবাগ থানার পুলিশ। ঘটনাটি ঘটে শনিবার দুপুরে। আটক ছাত্রলীগ নেতার নাম আসিফ আহমেদ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং শহীদুল্লাহ হলের ছাত্রলীগের কর্মসংস্থান সম্পাদক ছিলেন। ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনার সময় তিনিও ছাত্রলীগের সঙ্গে ছিলেন। তাদের আটকের বিষয়ে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, “ওটা বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বাজাচ্ছিল। এটা তো নিষিদ্ধ। এ জন্য নিয়ে আসা হয়েছে।”
৭ মার্চ নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানেক নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও এক শিক্ষার্থীকে সেহরির টেবিল থেকে তুলে মারধর করা হয়। ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া ভিডিও ফুটেজ অনুযায়ী দর্শন বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের ওই শিক্ষার্থী সেহরি খেতে বুয়েটের কাজী নজরুল ইসলাম হলের ক্যান্টিনে বসেছিলেন। সেখান থেকে টেনে-হিঁচড়ে বাইরে নিয়ে গিয়ে মারধর করা হয়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে শাহবাগ থানায় ফেলে রেখে যান জাতীয় ছাত্রশক্তির কয়েকজন নেতা। ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, এমন তথ্য ওসি পেলেন কোথা থেকে? তদারকি সরকার পাঠ্যপুস্তক থেকে ৭ মার্চের ভাষণ সরিয়ে জুলাই আন্দোলনকে অন্তর্ভুক্ত করে। সাত মার্চের ভাষণকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেই কি মানুষের মন থেকে মুছে ফেলা যাবে? এই ভাষণকে ইউনেসকো স্বীকৃতি দিয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই ভাষণটিকে কেন্দ্র করে গবেষণা চলছে।












Discussion about this post