বাংলাদেশের সেনাপ্রধান ওয়াকার ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে বলেছিলেন, নবনির্বাচিত সরকার শপথ নেওয়ার পরে পরে সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরে যাবে। সেই সঙ্গে তিনি এও বলেন, পুলিশ পুরোপুরি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ না নেওয়া পর্যন্ত সেনাবাহিনী থাকবে সহায়তামূলক ভূমিকায়। নতুন সরকারের বয়স এক মাস হতে চলেছে। অথচ সেনাবাহিনী এখনও ব্যারাকে ফিরে যায়নি। এই অবস্থায় গুঞ্জন তৈরি হয়েছে অপারেশন ক্লিনহার্ট – টু শুরু করতে চলেছে সরকার। এই গুঞ্জন ফিরিয়ে এনেছে ২০০২ সালের ভয়ংকর দিনের কথা। ক্ষমতায় সেই সময় বেগম জিয়া। আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি। মানুষের মনে ক্ষোভ আর চূড়ান্ত হতাশা। ঢাকার রাস্তায় একের পর এক ওয়ার্ডকমিশনারকে লক্ষ্য করে চলে গুলি। এছাড়া অস্বাভাবিক হারে বাড়তে থাকে হত্যা ও ডাকাতিসহ নানা ধরণের অসামাজিক কার্যকলাপ। জিয়া সরকার কার্যত বেসামাল হয়ে পড়ে। অভিযোগ ওঠে, বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে যে সব ওয়ার্ড কমিশনারকে বিএনপি থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল, তাদের অধিকাংশই ছিলেন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। পরিস্থিতির ক্রমেই অবনতি হতে থাকে। খালেদা জিয়া বিচলিত হয়ে পড়েন। সরকারের এক বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে খালেদা জিয়া স্বীকার করে নেন যে পরিস্থিতির তেমন কোনও উন্নতি হয়নি। সন্ত্রাস নির্মূলে জিয়া আরও সময় চেয়ে নেন। পুলিশ ও প্রশাসনের রদবদল করেও পরিস্থিতিতে লাগাম পরাতে পারেননি জিয়া। বিএনপি সরকারের আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমেদের “বাংলাদেশ : আ স্টাডি অফ দি ডেমোক্র্যাটিক রেজিমস” বইতে সে কথা উঠে এসেছে। ২০০২ সালে ১৬ অক্টোবর মধ্যরাত। বলা যেতে পারে ১৭ অক্টোবর। সারাদেশে একযোগে সাঁড়াশি অভিযানে নামে সেনাবাহিনী। মধ্যরাতে মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেওয়া হয়। অভিযোগ সেনাবাহিনী অভিযান শুরুর আগে পুলিশকে কিছু জানায়নি। রাস্তায় সেনা সদস্যদের গাড়ি দেখে মানুষ বুঝতে পারে। যদিও সেই সময় সরকারের তরফে বলা হয়েছিল, এটি সেনাবাহিনী – পুলিশ- বিডিআরের যৌথ অভিযানে প্রকৃতপক্ষে পুরো অভিযান পরিচালনা করে সেনাবাহিনী। সে সময়ের বিভিন্ন সংবাদপত্র পরীক্ষা করে দেখা যায় প্রথম দিনের অভিযানে ১৪ শো জনকে গ্রেফতার করা হয়। এদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠই বিএনপি কর্মী বা নেতা। এমনকী গুলিও চলে। নতুন সরকারের অপারেশন ক্লিন হার্ট – টু ঘোষণায় আবার সেই ভয়ংকর স্মৃতি ফিরে আসতে চলেছে।
ইউনূস সরকারের অপারেশন ডেভিল হান্টের লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগারদের ধরোর আর জেলে পোড়ো। বাধা দিতে এলে চালাও গুলি। অপারেশন ডেভিল হান্টের দৌলতে ইউনূস সরকার আওয়ামী লীগের ৩ লক্ষ ৫৯ হাজার কর্মীকে গ্রেফতার করে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হয়েছেন। বাংলাদেশে অনেকেই বলছে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাহলে সেনাবাহিনী কেন এখন ব্যারাকে ফিরে যায়নি? সেনাপ্রধান ওয়াকার তো বলেছিলেন নবনির্বাচিত সরকার শপথ নেওয়ার পরে পরে সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরে যাবে। তাহলে কি তারেক রহমান সরকারও কি সেনাশাসন জারি রাখতে চাইছে।
বাংলাদেশ সরকার বদলে যেমন সেনাবাহিনী কাজ করছে, সরকার ফেলার ক্ষেত্রেও সমানভাবে কাজ করেছে। তার টাটকা উদাহরণ হাসিনা সরকারের পতন। বলা হচ্ছে পাকিস্তানের মডেল অনুসরণ করে বাংলাদেশে একটি সরকার গঠন করা হয়েছে। ১৯৭৫ সালের পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী প্রান্তিক শক্তি ছিল না। ২০২৪-য়ের ৫ অগাস্টের পর থেকে সেটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আর একটি ঘটনা পরিষ্কার করে দিচ্ছে আশিফ নজরুল ও জোনায়েদ সাকিকে সেনাপ্রধানের কাছে পাঠায়, তখন বাংলাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্রের পালাবদল ঘটে। জোনায়েদ সাকি বর্তমার সরকারের পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী। আর আসিফ নজরুল বিএনপি সরকারের বুদ্ধিজীবী হিসেবেই পরিচিত। তাদেরকে সেনাপ্রধানের কাছে পাঠানোর উদ্দেশ্যে যে মহৎ নয়, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।












Discussion about this post