যে কোনও দেশের রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক প্রধান। কিন্তু বাংলাদেশে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের যে দৃশ্যপট তৈরি হল, তা দেখে বোঝার জো নেই যে সে দেশের রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক প্রধান। বিশৃঙ্খলা হতে পারে, তার একটা আন্দাজ আগেই পাওয়া গিয়েছিল। অধিবেশন শুরু হওয়ার আগের দিন জামায়াতে বৈঠক বসে। মূলত সংসদে তাদের রণকৌশল ঠিক করতেই এই বৈঠক। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে জামায়াতে ইসলামির নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর সংসদে ভাষণ দেওয়ার বিষয়টি তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর কথায়, “আমরা মনে করি রাষ্ট্রপতির সংসদে ভাষণ দেওয়ার কোনও অধিকার নেই। তিনি স্বৈরাচারের দোসর। কিন্তু বিএনপি কী কারণে এটি করছে, সেটা আমরা জানি না। ”
নায়েবে আমির আরও বলেন, বিএনপি কেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে দিয়ে সংসদে ভাষণ পাঠ করাচ্ছে সেটা তাদের কাছে পরিষ্কার নয়। তবে বিষয়টি নিয়ে দল কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যা সংসদ অধিবেশনের সময় জানিয়ে দেওয়া হবে। তাদের নেতৃত্বে বিরোধী দলের একটি পৃথক বৈঠক হয়। বিএনপির তরফে কিন্তু আগে থেকেই একটি বার্তা দিয়ে রাখা হয়েছিল। জামাতের জন্য তাদের বার্তা ছিল, তারা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। ফলে, জামায়াত বা এনসিপির মতো দলের সব কথা শুনে সংসদ চালাবার কোনও প্রয়োজন নেই। বিএনপি কোনও নড়বড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেনি যার জন্য তারা জামায়াতের ব্ল্যাকমেলের রাজনীতির শিকার হবে।
কিন্তু রাষ্ট্রপতির বিরোধিতা করতে গিয়ে “জুলাই জঙ্গী” হাসনাত আবদুল্লা যে সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর দিকে রে রে করে তেড়ে যাবেন, সেটা কল্পনার উর্ধ্বে। তার দৌড় দেখে এটা বুঝতে বিন্দুমাত্র কারও অসুবিধে হওয়ার কথা নয় যে রাষ্ট্রপতিকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করাই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল। তখন জামায়াতের সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের তাকে কোনওমতে আগলে ধরেন। জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতাদের দাবি রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পকে অভিসংশন করে গ্রেফতার করতে হবে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে এক মানবন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেও সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর বিরুদ্ধে সরব হতে দেখা যায় জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র আসিফকে। সংসদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে তাঁর বার্তা , “সংসদ সদস্যরা যদি এলাকায় ফিরে গিয়ে জনগণের সামনে বুক ফুলিয়ে মাথা উচু করে বলতে চান, তাহলে অবশ্যই ফ্যাসিবাদের সর্বশেষ চিহ্ন, সর্বশেষ যে প্রতীক এই রাষ্ট্রপতি যিনি এখানে আছেন, তাঁকে অপসারণ করতে হবে।
রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুরতে জামায়াতে এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির ভীষণ এলার্জি রয়েছে। এই প্রসঙ্গে একটি দিনের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। দিনটি ছিল রবিবার। তারিখ ১ মার্চ। সেদিন এনসিপির তরফে তাদের যুবসংগঠন জাতীয় যুবশক্তি একটি ইফতার পার্টির আয়োজন করে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি ওই অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে গ্রেফতার করে অভিশংসনের দাবি তোলেন। একই দাবি শোনা গিয়েছিল দলের মুখপাত্র আসিফ মামুদ সজীব ভুঁইয়ার গলাতেও। তিনি কার্যত হুঁমকি দিয়ে বসেন। সজীব ভুঁইয়া বলেন, “এই সংসদকে যদি আপনারা অপবিত্র হতে না দিতে চান, আপনারা যদি এই সংসদ অধিবেশন শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদের এক্সেটেনশন হিসেবে শুরু করতে না চান, তাহলে অবশ্যই প্রথম অধিবেশনেই সেই রাষ্ট্রপতিকে অভিসংশন করতে হবে। যিনি গণহত্যার সময় চুপ ছিলেন এবং গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়েও নানা ধরনের ষড়যন্ত্র করেছেন।”
অর্থাৎ বারুদ আগে থেকে মজুত করা ছিল। দরকার ছিল একটা জ্বলন্ত দেশলাই কাঠির। জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর ভাষণ আসলে সেই জ্বলন্ত দেশলাই কাঠি।












Discussion about this post