বাংলাদেশে নির্বাচনে বিএনপির বিজয় এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টা জোরদার করেছে ঢাকা। এই আবহে মার্চের শুরুতেই বাংলাদেশের শীর্ষ প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্সের (ডিজিএফআই) প্রধান একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে যোগ দিতে ভারত সফর করেছিলেন। তারেক রহমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এটিই প্রথম কোনও শীর্ষ কর্মকর্তার ভারত সফর ছিল। ভারতের গণমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সেপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নবনিযুক্ত ডিজিএফআই মহাপরিচালক মেজর জেনারেল কায়সার রশিদ চৌধুরী ১ থেকে ৩ মার্চের মধ্যে দিল্লি সফর করেছিলেন। সফরকালে তিনি ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র-এর প্রধান পরাগ জৈন এবং মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের ডিজি লেফটেন্যান্ট জেনারেল আর এস রমনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। ২ মার্চ একটি ব্যক্তিগত নৈশভোজের সময় দুই দেশের গোয়েন্দা প্রধানরা গোয়েন্দা তথ্য ভাগ করে নেওয়া এবং নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব গভীর করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলেন।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের মাটিতে ভারতবিরোধী কর্মকাণ্ড নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বিগ্ন ছিল ভারত। নতুন সরকারের সঙ্গে মিলে এই চ্যালেঞ্জগুলি মোকাবিলা করাই ভারতের অগ্রাধিকার। এই নিরাপত্তা সহযোগিতার প্রথম বড় পরিণাম দেখা গেছে পশ্চিমবঙ্গে। রাজ্যের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) রবিবার ঘোষণা করে যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতা শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকারীদের বনগাঁ থেকে গ্রেফতার করা হয়। ছাত্র-জনতার প্রবল আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ভারতে চলে যান শেখ হাসিনা। তখন থেকে তিনি নয়া দিল্লিতেই অবস্থান করছেন। তার সরকারের পতনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা মোহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে তখন থেকে ভারতের টানাপোড়েন চলছে। শেখ হাসিনা ফেরত চেয়ে প্রথম থেকেই বিচারের মুখোমুখি করতে চেয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠিও দিয়েছে। তবে এ বিষয়ে ভারত কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এ নিয়ে দুই দেশের সরকারের মধ্যে সম্পর্ক শীতল হয়েছে। বিক্ষোভ, পাল্টা বিক্ষোভসহ নানা ঘটনার পরম্পরায় একই দিনে পাল্টাপাল্টি হাই কমিশনার তলবের মত ঘটনাও ঘটেছে। প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে বাড়তে থাকা এ দূরত্বের মধ্যে গত কয়েকমাসে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার একাধিক বার্তা দেয় নরেন্দ্র মোদী সরকার। বিএনপির তরফেও ইতিবাচক হওয়ার আভাস দেওয়া হয়।
এরই মাঝে ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশি হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লা গেলেন ভারতীয় সেনার যুদ্ধ কলেজে। মধ্যপ্রদেশের মহউ-তে অবস্থিত এই কলেজে গিয়ে সেনা, নৌবাহিনী এবং বায়ুসেনা একাধিক অফিসারের সঙ্গে কথাবার্তা বলেন রিয়াজ। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে সেখানে সামরিক অফিসারদের সঙ্গে তাঁর আলোচনা হয় বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশি হাইকমিশনার। মহউ-তে সেনার কলেজে রিজায় হামিদুল্লাকে স্বাগত জানান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হরজিৎ সিং সাহি। সেনার কলেজের তরফ থেকে রিয়াজের সফরের ছবি প্রকাশ করা হয় সোশ্যাল মিডিয়ায়। এদিকে রিয়াজও এই সফর নিয়ে পোস্ট করেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। সেখানে তিনি জানান, আগামীতে দুই দেশ কীভাবে উভয়ের স্বার্থে তাদের মধ্যকার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করবে, তা নিয়ে কথা হয় তাঁর। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেয়। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে রদবদলের অংশ হিসেবে ২৩ ফেব্রুয়ারি কায়সার রশিদকে ডিজিএফআই প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর ফলে তার সফরটি ঢাকা থেকে নয়া দিল্লিতে নতুন সরকারের পক্ষ থেকে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সফর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বলে প্রিন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়।
প্রিন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, ডিজিএফআই প্রধান কায়সারের ভারত সফর আনুষ্ঠানিকভাবে ‘চিকিৎসাজনিত কারণে’ বলা হলেও বাংলাদেশ নিয়ে নয়া দিল্লির নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে তা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভারত আশঙ্কা করছে, বাংলাদেশে সহিংসতা বাড়লে তা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর শান্তি ও স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ভারত গত কয়েক মাসে ইঙ্গিত দিয়েছে তারা তারেক রহমানের বিএনপির সঙ্গে কাজ করতে এবং সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে আগ্রহী।












Discussion about this post