বিশ্বজুড়ে চলছে এক রাজনৈতিক অস্থিরতা। সেই অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে দক্ষিণ এশিয়াতেও। চলছে একে অপরকে দোষারোপের পালা। বলা হচ্ছে আন্তর্জাতিকমহল এখন আড়াআড়ি বিভক্ত। লডা়ই পশ্চিমাশক্তির সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের। অভিযোগ উঠেছে বিশ্বকে অস্থিতিশীল করে তোলার জন্য দায়ী একটি মাত্র দেশ – আমেরিকা। তারা আর কোনও আন্তর্জাতিক আইন, শৃঙ্খলা মানতে নারাজ। বিশ্বের যে সব প্রান্তে তুলনামূলকভাবে দূর্বল রাষ্ট্র রয়েছে, সেই সব রাষ্ট্রের ওপর তারা আধিপত্যবাদ কায়েম করতে চাইছে। সর্বশেষ উদাহরণ ভেনেজুয়েলা।
এখন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট যে বাংলাদেশে পালাবদলের নেপথ্য নায়ক আমেরিকা। ভারতকেও তারা অস্থির করে তোলার চেষ্টা করেনি যে তা নয়। আমরা সকলেই জানি, প্রধানমন্ত্রী মোদিকে হত্যার ছক পর্যন্ত কষেছিল আমেরিকা। বন্ধু রাশিয়া এবং সে দেশের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মোদির পরিত্রাতা হয়ে দাঁড়ান। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক চিত্র কিন্তু বদলে গিয়েছে। হাসিনা-পরবর্তী পর্যায়ে বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের মিত্রতার পারদ কোন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে, তা আমাদের সকলের জানা। মাঝখান থেকে ঘোলাজলে মাছ ধরতে নেমে পডেছে চিন।
সম্প্রতি চিন ও পাকিস্তানের মধ্যে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উঠে আসে কাশ্মীর, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান ইস্যু। বৈঠক শেষে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশ স্পষ্ট জানিয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় যে কোনও একতরফা পদক্ষেপের তারা বিরোধী। আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতাবস্থা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার উপর জোর দিয়ে অমীমাংসিত বিষয়গুলি আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে নেওয়ার বার্তাও দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর চিন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে ত্রিপাক্ষিক সহযোগিতার ‘নতুন ফল’ পেতে প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলা
বৈঠকের পরে দুই দেশের যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, দুই দেশ আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনেই দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক শান্তি শৃঙ্খলা ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখার ক্ষেত্রে জোর দিয়েছে। অমীমাংসিত বিষয়গুলিকে আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আছে বলেও জানানো হয়। বিবৃতি অনুযায়ী, জম্মু ও কাশ্মীর সম্পর্কে পাকিস্তানের অবস্থান ও ওই অঞ্চলে উন্নয়ন প্রসঙ্গে ইসলামাবাদের তরফে জানানো হয়েছে বেজিংকে। ‘ঐতিহাসিক বিরোধ’ মেটাতে জাতিসংঘের প্রস্তাব মেনে ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তি অনুযায়ী শান্তিপূর্ণ সমাধানের বার্তা দেওয়া হয়েছে চিনের তরফে। যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই দুই দেশের মূল লক্ষ্য।
জম্মু ও কাশ্মীর প্রসঙ্গে পাকিস্তানের অবস্থান বেজিংয়ের কাছে তুলে ধরা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসলামাবাদ। ওই অঞ্চলের উন্নয়ন এবং ‘ঐতিহাসিক বিরোধ’ মেটাতে রাষ্ট্রসঙ্ঘের প্রস্তাব ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তি মেনে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে বার্তা দিয়েছে চিন। যদিও বিবৃতিতে সরাসরি ভারতের নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে আন্তঃসীমান্ত জলসম্পদ ব্যবস্থাপনায় ‘আন্তর্জাতিক চাহিদা’ পূরণ এবং পারস্পরিক সমতা ও উপকৃত হওয়ার নীতির কথা তুলে ধরা হয়েছে, যা সিন্ধু জলচুক্তি ঘিরে নতুন করে জল্পনার সৃষ্টি করেছে।
আফগানিস্তান প্রসঙ্গেও দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানের অভিযোগ, কাবুল টিটিপি ও বালোচ জঙ্গিদের আশ্রয় দিচ্ছে। যদিও আফগানিস্তান এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবুও জঙ্গি দমনের দাবিতে ‘বন্ধু’ পাকিস্তানের পাশে দাঁড়িয়েছে চিন। বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, আফগানিস্তানের সরকারের সঙ্গে ‘নিবিড় যোগাযোগ’ রেখে রাজনৈতিক পরিকাঠামো, নীতিগত সংস্কার ও উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করবে চিন ও পাকিস্তান। সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় পাকিস্তানের ভূমিকার প্রশংসা করেছে বেজিং। একই সঙ্গে পাকিস্তানে কর্মরত চিনের নাগরিক, প্রকল্প ও প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ইসলামাবাদের উদ্যোগেরও প্রশংসা করা হয়েছে।
এ ছাড়া, চিন–পাক কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশেষ কর্মসূচি শুরুর ঘোষণাও করা হয়েছে। যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতার মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত অর্থনৈতিক করিডোরের উন্নততর সংস্করণ ‘২.০’ বাস্তবায়নের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে, এই বৈঠক দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহল।
তাইওয়ান, তিব্বতের জিজাং, হংকং ও দক্ষিণ চিন সাগর ইস্যুতে ‘চিনের অবিচ্ছেদ্য অংশ’ দাবি করে বেজিংয়ের পাশে দাঁড়িয়েছে পাকিস্তান। পাল্টা চিনও পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। উল্লেখ্য, আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের অভিযোগ কাবুল টিটিপি ও বালোচ জঙ্গিদের আশ্রয় দেওয়ার। আফগানিস্তানে জঙ্গি দাবির ইস্যুতে ‘বন্ধু’ পাকিস্তানকে সমর্থন জানিয়েছে চিন। আফগানিস্তানের মাটিতে জঙ্গী নির্মূল করার দাবি জানিয়েছিল ইসলামাবাদ। সেই দাবিকেই সমর্থন করেছে চিন। বিবৃতি অনুযায়ী, পাক-চিন ‘নিবিড় যোগাযোগ’ রেখে আফগানিস্তানের সরকারকে রাজনৈতিক পরিকাঠামো, নীতির সংস্কার ও উন্নয়নে মনোনিবেশ করতে সাহায্য করবে। প্রসঙ্গত, কাবুলের পক্ষ থেকে জঙ্গি সংগঠন সংক্রান্ত অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।












Discussion about this post