বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভাবনীয় চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ এক বিরল ঘটনার সাক্ষী থাকল। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণ এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে তারেক রহমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে নতুন এক রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গী তুলে ধরেছেন। বক্তব্যের একটি অংশে শেখ মুজিব কেবল একটি মাত্র দলের নেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন এই ভূখণ্ডের অন্যতম প্রধান সংসদ সদস্য। তিনি ছিলেন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পুরোধা। তারেক বলেন, বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির সূচনায় শেখ মুজিব একজন সংসদ সদস্য হিসেবে যে ভূমিকা পালন করেছিলেন তা ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের উচিত ইতিহাসের সত্যকে সাহসের সঙ্গে স্বীকার করা।
তারেক আরও বলেন, জাতির পিতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর অবস্থানকে দলীয় সংকীর্ণতার উর্ধ্বে রাখা প্রয়োজন। শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে তারেক জিয়ার মুখে বঙ্গবন্ধুর প্রশংসা শুনে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি করেছে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে আদর্শের একটি দেওয়াল ছিল। এই বক্তব্য সেই দেওয়ালে বড় ধরনের ফাটল ধরিয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। বিএনপি শীর্ষনেতৃত্ব থেকে বঙ্গবন্ধুর এমন অবদানের কথা স্মরণ এবং তাঁর অবদানকে স্বীকৃতি সাম্প্রতিক অতীতে কেন, কোনও কালেই হয়নি। বিএনপি স্বীকার করে না মুক্তিযুদ্দে শেখ মুজিবের আত্মত্যাগের কথা। তাদের মতে, মুক্তিযুদ্ধে সব থেকে বেশি অবদান রয়েছে জিয়াউর রহমানের। অনেকে মনে করছেন, তারেক রহমান এখন আর সেই প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে সরে আসতে চাইছেন। তারেকের বক্তব্যকে অনেকে জাতীয় ঐক্য গঠনের একটি প্রয়াস হিসেবে দেখতে চাইছেন। তারা এটিকে মাস্টারস্ট্রোক হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, তারেক রহমান বঙ্গবন্ধুর সংসদীয় ও জাতীয় পরিচয়কে স্বীকার করে নিয়ে আওয়ামী লীগের একক রাজনৈতিক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। সংসদ সচিবালয়ের নথিপত্রে বঙ্গবন্ধুর নাম একজন সংসদ সদস্য হিসেবে যেমন লিপিব্ধ আছে, ঠিক তেমনই তারেক রহমান সেই সত্যকে জনসমক্ষে এনে দেশের নতুন প্রজন্মের কাছে একটা ভারসাম্যপূর্ণ বার্তা দিতে চাইছেন। শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর প্রতি তারেক রহমানের আকষ্মিক সম্মান প্রদর্শনের ঘটনায় উত্তাল হয়ে উঠেছে বিএনপি। বঙ্গবন্ধুর প্রতি তারেক রহমানের শ্রদ্ধাকে তাঁর দলের কট্টরপন্থী ও তৃণমূলস্তরের নেতাকর্মীরা মেনে নিতে পারছেন না। তাদের কাছে শেখ মুজিব এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগ বিএনপির ওপর দমনপীড়ন চালিয়েছে। তাদের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করে জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। সব কিছুই হয়েছে শেখ হাসিনার নির্দেশে। তারেক রহমান কি সেই সব অত্যাচারের কথা, সেই সব বিভীষিকাময় দিনের কথা ভুলে গেলেন? দলনেত্রী খালেদা জিয়ার ওপর কম অত্যাচার চালায়নি আওয়মী লীগ। এত কিছুর পরেও সংসদে দাড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শেখ মুজিবের প্রশংসা করলেন? কী করে তিনি বলেন, “ বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির সূচনায় শেখ মুজিব একজন সংসদ সদস্য হিসেবে যে ভূমিকা পালন করেছিলেন তা ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের উচিত ইতিহাসের সত্যকে সাহসের সঙ্গে স্বীকার করা। ”
তবে বিএনপি চেয়ারপার্সনের মুখে বঙ্গবন্ধুর প্রশংসাকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ একটু অন্য চোখে দেখছেন। অতীতে বাংলাদেশ সংসদে স্বাধীনতার স্থপতি তথা জাতির পিতার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন তারেক রহমানের পিতা জিয়াউর রহমান, মা খালেদা জিয়া। রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন সেনা শাসক হুসেন মহম্মদ এরশাদও মুজিবের অবদানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। এমনকী বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান এক পর্যায়ে জাতির পিতা শিরোপা দেওয়ার বিষয়ে ব্যক্তিগত অভিমত ব্যক্ত করেন। যদিও তার দল ও সরকারের বড় অংশের আপত্তি থাকায় তিনি ওই কাজে বেশিদূর অগ্রসর হতে পারেননি।












Discussion about this post