নরেন্দ্র মোদির যুক্তরাষ্ট্র সফরেই ঠিক হয়েছিল মাস্টারপ্ল্যান। শেখ হাসিনাকে স্বপদে ফেরানো নিয়ে ভারতের চিন্তাধারায় সহমত প্রকাশ করেছিলেন স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে ট্রাম্প। তাই তিনি সাংবাদিক সম্মেলনে প্রকাশ্যেই বলেন, বাংলাদেশকে তিনি প্রধানমন্ত্রী মোদির ওপরেই ছাড়ছেন। মোদি দেশে ফিরতেই সেই মাস্টারপ্ল্যান মোতাবেক কাজ করার প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে ভারত। আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই বড় খবর আসতে চলেছে বলেই দিল্লিতে জোর গুঞ্জন। নয়া দিল্লির সাউথ ও নর্থ ব্লকে এখন তাই থমথমে পরিবেশ, অনেকটা সেই ঝড় আসার আগের পরিস্থিতি।
নয়া দিল্লির কয়েকটি সূত্র মারফত জানা গিয়েছে রবিবার রাতে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সুরক্ষা বিষয়ক ক্যাবিনেটের একটি বিশেষ বৈঠক হয়। নজিরবিহীনভাবে ওই বৈঠকে ভারতীয় সেনার তিন বাহিনীর প্রধানদের তলব করা হয়েছিল। ওই বৈঠকে ঠিক কি সিদ্ধান্ত হয়েছে তা পরিষ্কার করে জানা না গেলেও ওই বৈঠকটি যে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ সেটা বলাই বাহুল্য। কারণ প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফর করে ফিরেই এই বিশেষ বৈঠকে বসেন, যা পূর্ব নির্ধারিত ছিল না। অন্যদিকে তিন সামরিক বাহিনীর প্রধানদের তলব করা।
দ্বিতীয়ত এতটা গোপনীয়তা রক্ষা করা। কেন্দ্রীয় বিদেশ মন্ত্রক সূত্রে আরও জানা যাচ্ছে, নরেন্দ্র মোদি দেশে ফেরার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের দফতর থেকে ফোন এসেছিল। এটাও খুব তাৎপর্যপূর্ণ। ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা একটা বড় কিছু হতে চলেছে। ওই সূত্র আরও জানাচ্ছে, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরানো নিয়ে একটা মাস্টারপ্ল্যান তৈরি হয়েছে। আর সমগ্র ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করেছেন ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল। উল্লেখ্য মোদি-ট্রাম্পের বৈঠকে বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের পাশাপাশি অজিত ডোভালও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালকে যারা চেনেন, তাঁরা জানেন তিনি কতটা খুরধার বুদ্ধি ধরেন। সূত্রের খবর, হাসিনাকে স্বমহিমায় বাংলাদেশে ফেরাতে তিন পয়েন্ট ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করেছেন তিনি। আর এই পরিকল্পনা বহুদিন আগে থেকেই চলছিল তাঁর। ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে, শিলিগুড়ি করিডোর-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যে বিগত মাসে যে পরপর যৌথ সামরিক মহড়া দিয়েছিল ভারতীয় সেনা, সেটাও এই পরিকল্পনার অঙ্গ। অর্থাৎ ভারত বড় কোনও পরিকল্পনা করছে, এবং ভারতের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও এই পরিকল্পনায় সামিল হতে পারে বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।
এবার আসা যাক ভারত কি করতে পারে এই প্রসঙ্গে। বর্তমান ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন বাইডেন, ওবামা বা ক্লিনটনের মতো অন্য দেশে সরকার পরিবর্তনের পক্ষপাতী নয়। ভারতও অন্য কোনও দেশে সরাসরি আক্রমণের নীতি নেয় না। ফলে যা হবে সেটা অনেকটাই সন্তর্পনে হবে। আপাতত তিনটি পয়েন্ট উঠে আসছে গোটা পরিস্থিতি বিচার করলে। এক, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জিতে আসা আওয়ামী লীগ সরকারকে ফেলে দেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক চক্রান্ত এবং একটা অবৈধ উড়ে এসে জুড়ে বসা তদারকি সরকার এখন বাংলাদেশে ক্ষমতায় আছে। দুই, বাংলাদেশে দ্রুত সুষ্ঠ ও অবাধ নির্বাচন করিয়ে একটা গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা। তিন, হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী মেনে নিয়ে সরাসরি ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া। এক্ষেত্রে আমরা ১৯৭১ সালের ঘটনাবলী স্মরণ করতে পারি। সেবার ভারত পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জাতির দুর্দশা ও অত্যাচারের পরও ৯ মাস অপেক্ষা করেছিল পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর আগে। এবারও ভারত ৬ নাসের বেশি সময় অপেক্ষা করছে বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিবেচনা করতে। সেবার ইন্দিরা গান্ধীর কাছে আন্তর্জাতিক চাপ ছিল, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের।
কিন্তু এবার মোদির কুশলী কূটনৈতিক চালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতকেই দায়িত্ব দিয়ে বসে আছে। ফলে ভারত যদি সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেও বাংলাদেশে হাসিনাকে ফেরাতে চায়, সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ব্রিটেন, রাশিয়ার মতো প্রথমসারির দেশ বাঁধা দেবে না। অন্যদিকে চিন এই মুহূর্তে কিছুটা কোনঠাসা, ফলে চিনের দিক থেকেও বাঁধা আসবে ন্স। তবে ভারত প্রথমে চাপের নীতিই নেবে। যেমন বাংলাদেশে দ্রুত একটা নির্বাচন ও ইউনূস সরকারের বিদায়। পাশাপাশি ভারত চাপ দেবে ইউনূসের আমলে যে সমস্ত জঙ্গি নেতা জেলমুক্ত হয়েছে বা জেল ভেঙে পালিয়েছে তাঁদের ফের জেলে পাঠানোর জন্য। এই সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ বন্ধের ব্যাপারে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে একযোগে কাজ করবে সেটা ১৩ ফেব্রুয়ারির মোদি-ট্রাম্প বৈঠকেই স্থির হয়েছে। ফলে এই চাপ ইউনূসের কাছে ভারী পড়তে চলেছে, এটা বলাই বাহুল্য। ভারত জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে চাইবে বাংলাদেশে ক্রমশ শিকড় বিস্তার করা ইসলামী মৌলবাদী শক্তির বিনাশ করতে। এটা ইউনূস প্রশাসন মেনে না নিলে বল প্রয়োগের কৌশল কাজে লাগানো হতে পারে। এই কারণেই শিলিগুড়ি করিডোরে দুটি সামরিক মহড়া সেরে রেখেছে ভারত।
আর একটা কথা, ভারত যে পদক্ষেপই নিক না কেন, সেটা অতি দ্রুত হবে। সূত্রের খবর, সরকারিভাবে ১৯ ফেব্রুয়ারি নিরাপত্তা সংক্রান্ত ক্যাবিনেট বৈঠক ডাকা হতে পারে। সেখানেই গোটা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হতে পারে এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। তবে মূল অপারেশনের রূপরেখা জানানো হবে না বলেই মনে করা হচ্ছে। বিদেশ মন্ত্রক সূত্রে খবর, ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে ভারতে আসতে পারেন সৌদি আরব ঘুরে। এমনটাই সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তিনি সৌদি আরবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করবেন। ট্রাম্পের ভারত সফর এপ্রিলের প্রথম দিকে হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু এখন জানা যাচ্ছে ট্রাম্প মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহেই ভারতে আসতে পারেন। ফলে বাংলাদেশে অতি ভয়ঙ্কর খেলা হবে।












Discussion about this post