বিশ্বরাজনীতির এক অস্থিরতম অধ্যায়ের নাম মধ্যপ্রাচ্য। এখানকার একটি ছোট্ট ঘটনা যেমন তেল বাজারকে প্রভাবিত করতে পারে, তেমন বড়ো কোনও সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে কাঁপিয়ে দিতে পারে। ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যকার চলমান সংঘাত শুধু ওই অঞ্চলে নয়। দক্ষিণ এশিয়ার মতো দূরবর্তী অঞ্চলেও এর প্রভাব পড়তে বাধ্য। বাংলাদেশ সরাসরি এই যুদ্ধে অংশ নেয়নি। তবুও অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্বিক দিক থেকে বেশ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ইরান ও ইজরায়েল – দুটি দেশই মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ও রাজনৈতিক মানচিত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরান বিশাল পরিমাণে তেল উৎপাদক দেশ। বিশ্বের তেল বাজারে এর প্রভাব ব্যাপক। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তিনটি খাতে প্রভাব পড়বে।
প্রথমত জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেলে সব খাতে প্রভাব পড়বে। দ্বিতীয় প্রভাব পড়বে শ্রমবাজারে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে জ্বালানি খাতসহ পুরো আমদানি পণ্য সরবরাহের প্রভাব পড়বে। বর্তমান বাংলাদেশ মোট আমদানিকৃত পণ্যের ৩০ শতাংশ তিন ধরনের পণ্য। এর মধ্যে জ্বালানি তেল ছাড়াও রয়েছে খাদ্য ও সার। এই পণ্যগুলি অধিকাংশই হরমুজ প্রণালী দিয়ে আমদানি হয়। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য খুবই সামান্য। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ এবং ইরান একটি অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে। তবে এরপর সম্পর্ক বেশি এগোয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য অংশই সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার এবং ওমানের মতো দেশগুলির। ফলে, মধ্যে প্রাচ্যে কোনও ধরনের অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড়ো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব অব ডেভেলপমেন্টের প্রাক্তন মহাপরিচালক এম কে মুজেরীর বলেন, “ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধ শুরু হয়েছে। তবে এই যুদ্ধ শুধুমত্র দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইতোমধ্যে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা তৈরি করেছে। আর বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকটাই মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে, এই যুদ্ধ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এই প্রভাবের গভীরতা নির্ভর করবে যুদ্ধ কতটা স্থায়ী হয় তার ওপর।” তিনি কয়েকটি শঙ্কার কথা বলেন। এম কে মুজেরীর জানিয়েছেন, “প্রথমত বাংলাদেশ জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। এই সব জ্বালানি আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এর মধ্য এলএনজি এবং অশোধিত তেল উল্লেখযোগ্য। ” দ্বিতীয় বিষয়টি হল শ্রমবাজার। বাংলাদেশের অধিকাংশ শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করেন। গত কয়েক মাসে দেশের অর্থনীতিতে কিছুটা হলেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। এতে বড়ো কৃতীত্ব রেমিট্যান্সের। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা তৈরি হলে রেমিট্যান্স কমবে। এটি দেশের অর্থনীতিতে বড়ো আঘাত আসবে। তৃতীয়ত হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। এটি বন্ধ হলে তেল সরবরাহ প্রভাবিত করবে। এর ফলে বাংলাদেশে বিনিয়োগ প্রভাব পড়বে। বাড়বে পরিবহন ভাড়া। পণ্যের উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাবে। মূল্যস্ফীতিও প্রভাব ফেলবে। এছাড়া সরকার জ্বালানি তেলের যে মূল্য সমন্বয়ের চেষ্টা করছে, সেটিও বন্ধ হয়ে যাবে। তবে সব কিছু নির্ভর করছে যুদ্ধ কতদিন স্থায়ী হয় তার ওপর।
পূর্বতন তদারকি সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, “ ইরান ও ইজরায়েল দুই দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি খুব বেশি অর্থনৈতিক সম্পর্ক নেই। ইজরায়েলের সঙ্গে একেবারেই নেই। ইরানের সঙ্গে কিছুটা আছে। তবে সম্পর্ক থাকুক অথবা না থাকুক যুদ্ধ কোনওভাবেই কাম্য নয়। এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এই যুদ্ধে বাংলাদেশ কাকে সমর্থন করবে সেটাও একটি প্রশ্ন। ”












Discussion about this post