বাংলাদেশে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদীয় নির্বাচনের ঠিক এক সপ্তাহ আগে হঠাৎ করে মার্কিন দূতাবাসের ভিতরের একটি আলোচনা ফাঁস হয়। একজন মার্কিন কূটনীতিকের বিবৃতি প্রকাশ করে বিবিসি জানায়. যেখানে জামায়াতকে ক্ষমতায় আনার মার্কিন ইচ্ছা প্রতিফলিত হয়। আমেরিকা ঠিক কী কারণে জামায়াতকে ক্ষমতায় দেখতে চেয়েছিল? তাদের কি সেই ইচ্ছা এখনও রয়েছে? প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কের সমীকরণ ঠিক কেমন হবে? মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের ঢাকা সফরের প্রেক্ষিতে এই সব প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসছে।
প্রায় একই ধরনের খবর ফাঁস করেছে ওয়াশিংটন পোস্ট। তাদের প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা দ্রুত বদলে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে দেশটিতে কর্মরত মার্কিন কূটনীতিকরা ইসলামপন্থী এ রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী—এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। গত ১ ডিসেম্বর ঢাকায় নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এক মার্কিন কূটনীতিক বলেন, বাংলাদেশ ‘আরো বেশি ইসলামমুখী’ হয়ে উঠেছে এবং ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভালো ফল করবে।’ অডিও রেকর্ডিং অনুযায়ী, ওই কূটনীতিক বলেন, ‘আমরা চাই তারা (জামায়াত) আমাদের বন্ধু হোক।’ তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রশ্ন করেন, ‘জামায়াতের প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠনের নেতাদের নিজেদের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানাতে তারা আগ্রহী কিনা।’ ওই কূটনীতিক বলেন, ‘আপনারা কি তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন? তারা কি আপনাদের শো-তে আসবে?’ ওই কূটনীতিকের বক্তব্যের বিষয়ে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে কথা বলেছে ওয়াশিংটন পোস্ট। ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র মোনিকা শাই ওয়াশিংটন পোস্টকে দেয়া এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ডিসেম্বরের ওই বৈঠকটি ছিল একটি নিয়মিত, অব দ্য রেকর্ড আলোচনা, যেখানে মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তারা ও স্থানীয় সাংবাদিকরা অংশ নেন।’ তিনি আরো জানান, ‘ওই আলোচনায় একাধিক রাজনৈতিক দলের প্রসঙ্গ এসেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে অবস্থান নেয় না।’ বাংলাদেশের জনগণ যে সরকারই নির্বাচিত করুক, যুক্তরাষ্ট্র তার সঙ্গেই কাজ করবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ নিয়ে আমেরিকার হিসেবটা বদলাতে শুরু করেছে গত বছরের অক্টোবর থেকে। গত ২২ অক্টোবর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু-রের স্থলাভিষিক্ত হন পল কাপুর। একই সময় ভারত এবং বাংলাদেশেও নতুন রাষ্ট্রদূত পাঠায় আমেরিকা। পল কাপুর একজন অধ্যাপক। পিএইচডি করেছেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। আমেরিকার নেভাল স্কুলের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে অধ্যাপনা করেন। একই সঙ্গে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং ম্যাক্কেনা কলেজেও শিক্ষাকতা করেছেন। পেশায় অধ্যাপক হলেও পল কাপুর ডোনাল্ড ট্রাম্পের অত্যন্ত আস্থাভাজন। আগেও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের নীতি নির্ধারণের দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে কাজ করেছেন। ভারত, আফগানিস্তান, পাকিস্তান বিষয়ে তাঁকে বিশেষজ্ঞ বলা যায়। এই সব বিষয়ে তাঁর অসংখ্য লেখা এবং বই আছে। তাঁর বিখ্যাত বই “Jihad as Grand Strategy ” বইতে দেখিয়েছেন কীভাবে ভারত, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানে ছায়াযুদ্ধের কৌশল হিসেবে জিহাদকে ব্যবহার করা সম্ভব।
পল কাপুরকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে নিয়োগ করার কয়েকদিন পরেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউজে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল শারার সঙ্গে বৈঠক করেন। তাঁর সংগঠন ২০১৪ সাল থেকে আমেরিকার নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের তালিকায় ছিল। ২০২৪ য়ে সিরিয়া বাশার আল আশাদ সরকারের পতন হলে এই সংগঠনটি সিরিয়ার দায়িত্ব নেয়। আল শারা সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। আমেরিকা তাঁর সংগঠনকে কালো তালিকা থেকে মুক্ত করে দেন। আমেরিকা এবং ইজরায়েলের সমর্থনে সিরিয়ায় ক্ষমতায় আসেন আল সারার। এতোদিন যে সংগঠনকে বিশ্ববাসী সন্ত্রাসী সংগঠন বলে চিনত, দেখা গেল তারাই আমেরিকার পরম বন্ধু। আল শারারের জিহাদকে আমেরিকা সিরিয়ার বিরুদ্ধে প্রক্সিযুদ্ধ হিসেবে চালিয়ে এসেছে। সবাই জানত এরা যুদ্ধ করছে ইসলামের জন্য। আসলে এরা যুদ্ধ করছে আমেরিকার জন্য। ডেমোক্র্যাটদের এই কৌশলের সঙ্গে ট্রাম্পের বিরোধ আছে। হয়তো এ কারণে জামায়াতকে পছন্দ করছে আমেরিকা। পল কাপুরকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের পর ভারতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ করা হয় সার্জিও গোরকে। সঙ্গে দেওয়া হয় এক বিশেষ দায়িত্ব। দিল্লি এসেই তৎপর হন গোর। বৈঠক করেন বাংলাদেশের তদারকি সরকার প্রধান ইউনূসের সঙ্গে। ছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান। সেই আলোচনার বিষয় ছিল বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও নির্বাচন।












Discussion about this post