তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর বেশ কিছু দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ করেছেন। বিএনপি নেতারা যখনই হাতে আইনের শাসন তুলে নিচ্ছেন বা তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছেন, তখনই তাঁকে পদক্ষেপ করতে দেখা গিয়েছে। প্রশ্ন হল, তারেক গণমানুষের আকাঙ্খা কতটা পূরণ করতে পারবেন? এগুলোকি শুধুই লোক দেখানো? যেহেতু তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন এবং সদ্য সদ্য দায়িত্ব নিয়েছেন, সেই জন্যই জনমানসে একটা ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করার উদ্দেশ্যে নিয়ে তাঁর এই সব পদক্ষেপ। না কি সত্যিকার অর্থেই আগের সব শাসকদের থেকে তিনি একটি ব্যতিক্রমী হয়ে থাকতে চান। ধরা যাক বরিশালের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসের ঘটনা। সেখানে দলের বেশ কয়েকজন কর্মী ঢুকে তাণ্ডব চালান। খবর কানে যেতেই তাদের গ্রেফতার করতে তারেক রহমান পুলিশকে নির্দেশ দেন। আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর লিঙ্কনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাঁকে আদালতে হাজির করানো হয়। আদালত তাকে জেল হেফাজতের নির্দেশ দেয়। তারেক রহমান একপ্রকার চাপে পড়েই সাদিকুরকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষদের একাংশের অভিমত। এজলাসে হামলার ঘটনায় বিচারক থেকে আইনজীবী সকলেই একযোগে জানিয়ে দেন, তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তাই, তারা আদালতে আসবেন না। সেই হুমকির প্রেক্ষিতেই তারেক রহমান আইনজীবী সমিতির সভাপতিকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেন বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে এই যুক্তি খণ্ডন করছে আরও একটি ঘটনা। বেড়িবাঁধার ২২টি মেহগনি গাছ কাটার অভিযোগে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা বিএনপি সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে। পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে। পুলিশ সুপার বলেন, “মিঠামাইন উপজেলা সদরের কামালপুর বেড়িবাঁধের গাছ কেটে ফেলার ঘটনায় জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়। সেই অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে।” বিএনপি সুপ্রিমো তারেক রহমানের কানে খবর যেতেই তিনি ওই সভাপতির সদস্যপদ বাতিলের নির্দেশ দেন। দলীয় নেতৃত্ব দ্রুত সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করে। প্রশ্ন হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কতদিন মানুষের এই আবেগকে সম্মান দিতে পারবেন?
হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দলে একবার শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া চালু করেন। দলে যে সব নেতা কর্মীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে এবং সেই সব অভিযোগের প্রমাণও পাওয়া যায়। সেই সব নেতাদের তিনি দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু পরবর্তী দেখা গেল দুর্নীতি বিরোধী অভিযান একসময় ক্যাসিনো বিরোধী অভিযানে পর্যবসিত হয়। কারণ এতো এতো দুর্নীতির ঘটনা সামনে আসতে শুরু করে যা সামালা দেওয়া সম্ভব ছিল না হাসিনার। ফলে তিনি দলে শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেন। ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছিল – “পশম বাছতে গেলে কম্বল টেকে না” দশার মতো।
সালটা ২০১৯-য়ের সেপ্টেম্বর। সারাদেশে শোরগোল ফেলে দেয় সংবাদমাধ্যমের একটি খবর। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু করে পুলিশ। ১৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইয়ংমেন্স ফকিরাপুল ক্লাব থেকে শুরু হয় অভিযান। একই রাতে অভিযান চলে ঐতিহ্যবাহী ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, মুক্তিযোদ্ধ সংসদ ক্রীড়াচক্র, গোল্ডেন ঢাকা বাংলাদেশ ক্লাবে। জব্দ করা হয় ক্যাসিনোতে জুয়া খেলার বিপুল সামগ্রী। গ্রেফতার করা হয় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া। ২০১৪ সালে বিরোধীদল বিহীন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয় আওয়ামী লীগ। তারা দ্বিতীয়বার সরকার গঠন করে। এরপরেই লাগামহীন দুর্নীতি, অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন দলের অনেক নেতা। পরে অবশ্য বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ছিলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাট, তারেকুজ্জামান রাজিব, হাবিবুর রহমান মিজান, ময়নুল হক মঞ্জু, যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া, জি কে শামীমকে।
ক্যাসিনো বিরোধী অভিযানেও দেখা গেল সীমাব্ধতা। যুবলীগের তৎকালীন সভাপতি ওমর ফারুক শেখ পরিবারের সদস্য হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি। এখানেই তারেক রহমানের সাম্প্রতিক নেওয়া পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তিনি তাঁর পদক্ষেপ চালিয়ে যেতে পারবেন তো? না কি শেখ হাসিনার মতো তাঁকেও একটা সময় থেমে যেতে হবে?












Discussion about this post