আবার বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছে ডিপ স্টেট। জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী পর্যায়ে হাসিনা সরকারের পতনের পর এসেছিল ডিপ স্টেটের প্রসঙ্গ। বলা হচ্ছিল, একটি নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছে ডিপ স্টেট। অভিযোগের নিশানায় ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। যদিও ট্রাম্প সেই অভিযোগ অস্বীকার করেন। এই প্রসঙ্গে হাসিনা ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পর বিভিন্ন গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারের কথা বলতে হয়। প্রথম দিকের সাক্ষাৎকারে তাঁর মুখে ডিপ স্টেট শব্দটি শোনা যায়নি। পরবর্তীকালে তিনি সরাসরি আমেরিকাকে দায়ী করেন। জানিয়ে দেন, আমেরিকা তাঁকে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ তুলে দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিল। কিন্তু দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিয়ে তিনি কোনওভাবেই সেন্ট মার্টিন দ্বীপ আমেরিকার হাতে তুলে দেবেন না। তার জন্য ক্ষমতা থেকে তাঁকে সরে যেতে হলে তিনি চলে যাবেন। হাসিনা ক্ষমতা থেকে সরে গিয়েছেন। মুহাম্মদ ইউনূস তদারকি সরকার প্রধানের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এই পালাবদল ও ইউনূসের ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পিছনেও যে আমেরিকার হাত ছিল, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। যদিও ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি দাবি করে যে তারা আর রেজিম চেঞ্জের পক্ষপাতি নন। কিন্তু মার্কিন মুলুক যে তাদের চরিত্র বদল করতে রাজি নয়, তার একাধিক উদাহরণ রয়েছে। পাকিস্তানে ইমরান সরকারকে ক্ষমতা থেকে তারাই সরিয়ে দিয়েছিল। নেপালেও পালাবদলের পিছনে তাদের হাত রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এমনকী ভারতেও তারা পালাবদল চেয়েছিল। কিন্তু পেরে ওঠেনি।
এবার তো সরাসরি তদারকি সরকারের সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের মুখে শোনা গেল ডিপ স্টেটের কথা। সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব পালনের শুরুর দিকেই ডিপস্টেটের ভিতরের কিছু শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান তাদের পক্ষ থেকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়। কী বলেছেন, পূর্বতন তদারকি সরকারের এই উপদেষ্টা ? তিনি বলেছেন, তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার যেন ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে পারে– ‘ডিপ স্টেট’ এমন একটা স্ট্রাটেজি সাজিয়ে দিয়েছিল। আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ‘আমরা যখন সরকারের দায়িত্বে ছিলাম, শুরুর দিকে আমাদের বিভিন্ন শক্তিশালী ইনস্টিটিউশন, যাদেরকে আসলে ‘ডিপ স্টেট’ বলা হয়, তাদের কাছ থেকে আমাদের অফার করা হয়েছিল। বলা হয়েছিলো, ‘শেখ হাসিনার যে মেয়াদ আছে ২০২৯ সাল পর্যন্ত, সেটি আপনারা শেষ করুন। আমরা আপনাদের সহযোগিতা করব।’
তিনি জানান, প্রস্তাবের সঙ্গে কিছু শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে এসব গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি একটি রাজনৈতিক রোডম্যাপও তুলে ধরা হয়। ওই রোডম্যাপে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সাজা বহাল রেখে নির্বাচনী প্রক্রিয়া প্রভাবিত করার পরিকল্পনার কথা বলা হয়।’ আসিফ বলেন, আদালতের মাধ্যমে মামলার কার্যক্রম দীর্ঘায়িত করে বিএনপি নেতাদের নির্বাচন থেকে দূরে রাখার কৌশল সাজানো হয়। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে থাকা সাজা বহাল থাকলে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারতেন না। তার কথায় ডিপ স্টেট পুরো একটি কৌশল তৈরি করে দিয়েছিল। সেই কৌশল হল, কীভাবে তাদের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে ক্ষমতায় থাকা যায়। তবে এনসিপি তাদের সেই প্রস্তাবে সায় দেয়নি। তিনি আরও বলেন, এনসিপি একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চেয়েছিল বলেই তারা স্বেচ্ছায় অন্তর্বর্তী সরকার থেকে পদত্যাগ করেন।
আসিফের ভাষায় তাদের অফার করা হয়েছিল। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, তারা ডিপ স্টেটের টোপ গিলতে চায়নি। কিন্তু বাস্তবে কি তারা রাজি ছিল না? গত ১৮ মাস তারা যে ক্ষমতায় ছিলেন, তার জন্য কি আমেরিকার আশীর্বাদি হাত তাদের মাথায় ছিল না? মাত্র দু মাসের আন্দোলনে যদি একটি সরকারকে ডিপ স্টেট উপড়ে ফেলতে পারে, তাহলে ইউনূস সরকারের দেড় বছর ক্ষমতায় থেকে যাওয়া আমেরিকার প্রচ্ছন্ন মদত ছাড়া কোনওভাবেই হতে পারে না।











Discussion about this post