বিগত এক বছরে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট একাধিকবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। হাউস অব কমন্সে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের এক অধিবেশনে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির এমপি ব্যারি গার্ডিনার এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রীতি প্যাটেল বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর অত্যাচার ও হামলার ঘটনা বৃদ্ধির অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। ২০২৫ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সম্প্রতি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এই ঘটনা নিয়েও তীব্র নিন্দা ও সমালোচনা করল। গত ১৫ই জুলাই ব্রিটিশ এমপি বব ব্ল্যাকম্যান এবং বাংলাদেশ ইউনিটি ফোরামের উদ্যোগে আয়োজিত এক সংসদীয় আলোচনায় বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংকট নিয়ে বিশেষভাবে আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, মুহাম্মদ ইউনূস সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করতে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহার করছে। বিশেষত মে মাসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে তাঁরা অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের ওপর নজিরবিহীন আঘাত বলে আখ্যা দিয়েছে। এখনেই শেষ নয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসি-র কাছে একটি প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে, যেখানে নির্বিচার গ্রেফতার ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত অভিযোগ উপস্থাপন করা হয়েছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত নির্বাচনের আয়োজনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে ব্রিটিশ সরকার। এই বিষয়ে তাঁরা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন বলে জানানো হয়েছে।
এই বিষয়ে ব্রিটেনের পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ ও উন্নয়ন দফতর একটি বিবৃতিও জারি করেছে। তাতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে একটি স্থিতিশীল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অত্যন্ত জরুরি। ব্রিটিশ এমপিরা ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণার পাশাপাশি দ্রুত নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন ব্রিটিশ হাউস অফ কমন্সের জনপ্রতিনিধিরা। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্নি টিউলিপ সিদ্দীক ব্রিটেনের শাসকদল লেবার পার্টির গুরুত্বপূর্ণ সাংসদ। তাঁর বিরুদ্ধেও একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ আনে ইউনূস সরকার। এর জেরে মন্ত্রীত্ব ছেড়েছিলেন টিউলিপ। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের তরফে আলাদা করে তদন্ত করেও কোনও দুর্নীতির খোঁজ পাওয়া যায়নি। এটা নিয়ে এমনতিই ক্ষুব্ধ ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার। কয়েকমাস আগে মুহাম্মদ ইউনূসের লন্ডন সফরে তাঁর সঙ্গে দেখাও করেননি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। এমনকি তাঁকে রাষ্ট্রপ্রধানের মর্যাদাও দেয়নি ব্রিটিশ সরকার। যা নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি। এবার বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা নিয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টই উষ্মা প্রকাশ করল। শুধু ব্রিটেন নয়, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টও মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে অস্বীকার করেছিলেন।
একদিকে যখন আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচিত হতে শুরু করেছেন মুহাম্মদ ইউনূস। অন্যদিকে শেখ হাসিনা তাঁর দলকে নতুন করে সাজাতে শুরু করে দিয়েছেন বিদেশে বসেই। এই মুহূর্তে ভারতে অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। জানা যাচ্ছে তিনি নিজের ছেলেমেয়েকে অঘোষিতভাবে দলের নেতৃত্বে একেবারে সামনের সারিতে নিয়ে আসছেন। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ পরিচালনার ক্ষেত্রেও বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছেন দলের সর্বোচ্চ নেত্রী। এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের মূল চালিকা শক্তি কার্যত প্রতিবেশী দেশ ভারতেই রয়েছে। হাসিনা-সহ দলের বহু নেতা-কর্মী ভারতেই আশ্রয় নিয়েছেন। শেখ হাসিনা ও তাঁর কন্যা সায়মা ওয়াজেদ দিল্লিতে, ছেলে সজীব ওয়াজেদ আমেরিকার ভার্জিনিয়ায় এবং দলের বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ নেতা কলকাতায় অবস্থান করছেন। অর্থাৎ কিছুটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছেন সকলে। কিন্তু আজকের প্রযুক্তির জমানায় এটা কোনও দূরত্বই নয়। জানা যাচ্ছে শেখ হাসিনা বরং বেশি ভরসা রাখছেন দলের তিনজন নেতার ওপর, যারা প্রত্যেকেই আপাতত কলকাতায় আছেন। এরা হলেন বাংলাদেশের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক সংসদ সদস্য ও একদা প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বাহাউদ্দিন নাসিম এবং আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক এমপি জাহাঙ্গীর কবির নানক। এদের পাশাপাশি সজীব ওয়াজেদের নেতৃত্বে আমেরিকায় আর একটি টিম কাজ করছেন দলের অনুকূলে ‘ন্যারেটিভ নির্মাণ’ বা বয়ান তৈরি করা এবং বিদেশের সংবাদমাধ্যমে আওয়ামী লীগের বক্তব্য তুলে ধরতে। হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলও বিশেষ দায়িত্ব পেয়েছেন। কিন্তু কাগজে-কলমে এখনও যিনি আওয়ামী লগের সাধারণ সম্পাদকের পদে আছেন, সেই ওবায়দুল কাদের দলের এই নতুন কাঠামোতে একেবারেই উপেক্ষিত। তাঁর সঙ্গে একবারও শেখ হাসিনা দেখা করেননি বলেই খবর। উল্লেখ্য, তিনিও কলকাতায় আছেন। ওয়াকিবহাল মহল মনে করছেন, হাসিনার নির্দেশে এবং ভারতীয় গোয়েন্দাদের পরামর্শক্রমে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রচার শুরু করে দিয়েছে আওয়ামী লীগের নেতারা। যার সুফল ইতিমধ্যেই পেতে শুরু করেছে বাংলাদেশের নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলটি।
আবার বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছে ডিপ স্টেট। জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী পর্যায়ে হাসিনা সরকারের পতনের পর এসেছিল ডিপ স্টেটের...
Read more












Discussion about this post