পতনের ১৪ মাস পর থেকে আচমকা বাংলাদেশের মাটিতে তেড়েফুঁড়ে নেমেছে আওয়ামী লীগ। এই মুহূর্তে তাঁদের সর্বোচ্চ নেত্রী শেখ হাসিনা-সহ শতাধিক শীর্ষ নেতা বাংলাদেশের বাইরে। কয়েকশো নেতা ও কয়েক হাজার কর্মী বাংলাদেশে জেলবন্দী। তবুও যেন কোনও এক অদৃশ্য জাদুকাঠির ছোঁয়ায় আওয়ামী লীগ নতুন জীবন পেয়েছে। মুহাম্মদ ইউনূস সরকারকে কার্যত ল্যাজে-গোবরে করে ছাড়ছে প্রতিনিয়ত। গত বছর ৫ আগস্টের পর এই প্রথমবার শেথ হাসিনার আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে। ১০ থেকে ১২ নভেম্বর তিনদিন বাংলাদেশের সমস্ত জেলা-উপজেলায় তাঁরা ইউনূস সরকারবিরোধী মিছিল, প্রতিবাদ সভার আয়োজন করবে। আর ১৩ নভেম্বর আওয়ামী লীগ ঢাকাজুড়ে লকডাউনে্র ডাক দিয়েছে। কারণ ওই দিনই ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার তারিথ জানাবে। মনে করা হচ্ছে, বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও স্বারাষ্ট্রমন্ত্রীর সর্বোচ্চ শাস্তি হতে পারে প্রথম মমলাতেই। আর তা আঁচ করেই আন্দোলনের ঝাঁজ বাড়াচ্ছে আওয়ামী লীগ। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, দুটি উপায়ে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপর চাপ বৃদ্ধি করছেন শেখ হাসিনা।
প্রথমটি হল, ঝটিকা মিছিল, প্রতিবাদ মিছিল-সহ মাঠে নেমে সরকারবিরোধী প্রচারের তেজ বাড়ানো। আর দ্বিতীয়টি হল, আন্তর্জাতিক মঞ্চগুলিকে ব্যবহার করে মুহাম্মদ ইউনূসের উপর চাপ বৃদ্ধি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-সহ পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলি নিজেদের গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী বলেই মনে করে। কিন্তু বাংলাদেশে জোরপূর্বক ক্ষমতা দখলকারী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে একটি নির্বাহী আদেশ জারি করে বাংলাদেশের সবচেয়ে এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দলকে কার্যত নিষিদ্ধ করে রেখেছে সেটা এবার গোটা বিশ্বকেই ধরে ধরে জানাচ্ছে আওয়ামী লীগ। এটা যে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রিক অধিকার লঙ্ঘণের মতো গুরুতর বিষয়, সেটাও স্মরণ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে শেখ হাসিনার দল। গত শনিবার ঢাকায় জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির প্রতিনিধি স্টেফান লিলাকে ১৮ পাতার চিঠি দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। দলের পক্ষে চিঠিটি পাঠিয়েছিলেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। ওই চিঠির অনুলিপি জাতিসংঘের মহাসচিব, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি, জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ-সহ জাতিসংঘের কাজে যুক্ত ব্যক্তিবর্গ এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থাগুলির কাছেও পাঠিয়ে দিয়েছেন ওই আওয়ামী নেতা। যা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
ওই চিঠিতে মূলত বাংলাদেশে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নয়’ এমন নির্বাচনে সহযোগিতা থেকে সরে আসতে অনুরোধ করা হয়েছিল জাতিসংঘের কাছে। পাশাপাশি চিঠিতে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে ইউএনডিপির নির্বাচনী সহযোগিতা, ব্যালট প্রজেক্ট এবং আসন্ন নির্বাচনের বিষয়ে সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার বিষয়ে আমরা গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করছি। যে নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলকও নয়, বিশ্বাসযোগ্যও নয়। এ ধরনের সম্পৃক্ততা আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘের মূলনীতি এবং অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রসারের ক্ষেত্রে ইউএনডিপির ম্যান্ডেট লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করে। এ ক্ষেত্রে উল্লেখ্য, চিঠিটির শিরোনাম ছিল, ‘বাংলাদেশে ইউএনডিপির নির্বাচনি সহযোগিতা এবং জাতিসংঘ সনদের নিরপেক্ষতা, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং মৌলিক অধিকারের মূলনীতি লঙ্ঘনের বিষয়ে উদ্বেগ’। রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই একটি চিঠিই মুহাম্মদ ইউনূসের ভিত নড়িয়ে দিয়েছে। তাই তড়িঘড়ি বিবৃতি দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে চেয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কারিগরি সহযোগিতা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ জাতিসংঘে যে চিঠি দিয়েছে, তাতে কোনো কাজ হবে না। কেন কাজ হবে না, এই বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টার সাফাই, নির্বাচন একটা আভ্যন্তরীণ বিষয়। আওয়ামী লীগ এর মাধ্যমে নির্বাচন ঠেকিয়ে দিতে পারবে না।
মজার বিষয় হল, আওয়ামী লীগ ওই চিঠিতে একবারও নির্বাচন স্থগিত বা বাতিল করার দাবি জানায়নি। বরং যুক্তপূর্ণভাবে প্রশ্ন তুলেছে, একটা প্রাচীন রাজনৈতিক দলকে বাদ রেখে কিভাবে অন্তর্ভূক্তিমূলক নির্বাচন হয়? নির্বাচন বয়কট করা এক ব্যাপার আর নির্বাহী আদেশ জারি করে কোনও রাজনৈতিক দলকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখা আরেক বিষয়। যা ইউনূস সরকার করেছে। আর এটাই জাতিসংঘ-সহ বিশ্বের বহু গণতান্ত্রিক দেশে চিঠি দিয়ে জানাতে শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। জানা যাচ্ছে, এবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রী মার্কো রুবিওকেও একই চিঠি দিতে চলেছে শেখ হাসিনার দল। উল্লেখ্য, মার্কিন গোয়েন্দা মহাপরিচালক তুলসী গ্যাবার্ড দিন কয়েক আগেই জানিয়েছিলেন, ট্রাম্প প্রশাসন এবার সরকার বদলের পুরোনো খেলা বন্ধ করে নতুন নীতি গ্রহণ করেছে। ঠিক এই আবহেই আওয়ামী লীগ তাঁদেরই হাতের পুতুল হিসেবে পরিচিত মুহাম্মদ ইউনূসের মুখোশ খুলতে পত্রবোমা পাঠানোর ব্যবস্থা করছে। যা সামলানো শান্তির নোবেলজয়ীর জন্য কঠিন একটি চ্যালেঞ্জ।












Discussion about this post