আগামী রবিবার মহালয়া। তারপর থেকেই দুর্গোৎসবের আবহ তৈরি হয়ে যাবে এ পার বাংলায়। কিন্তু ওপার বাংলায় এখনও আতঙ্কের পরিবেশ। বাংলাদেশে কমবেশি ৩০ হাজার দুর্গাপুজো হয়। গত বছরও গোলমালের মধ্যে দিয়ে নমো নমো করে পুজো সেরেছিল বহু পুজো কমিটি। এবার সবরকম নিরাপত্তার আস্বাস দিয়েছিল বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস নিজেই ঢাকেশ্বরী মন্দির পরিদর্শন করেন, এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু এই বাংলাদেশ যে পরিবর্তিত বাংলাদেশ, তা আরও একবার প্রমান করে দিল মৌলবাদী সংগঠনগুলি। দুর্গাপুজোর ঠিক আগেই ফের বাংলাদেশের দুটি মন্দিরে প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা সামনে এল। প্রথমটি ঢাকার অদূরে গাজিপুর এবং দেশের পশ্চিমের জেলা কুষ্টিয়ায়। দু-জায়গাতেই রাতের অন্ধকারে কে বা কারা আংশিক তৈরি হওয়া দুর্গা, লক্ষ্ণী, গণেশ, সরস্বতী এবং কার্তিকের মূর্তি ভেঙে দিয়ে যায় বলে অভিযোগ। জানা যাচ্ছে, বুধবার বিকেলে গাজিপুর সদর উপজেলার কাশিমপুর শ্মশান মন্দিরে আংশিক তৈরি ছ’টি প্রতিমা ভাঙচুর করেছে দুষ্কৃতীরা। অপরদিকে বাংলাদেশের পশ্চিমপ্রান্তের জেলা কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলায় একটি মন্দিরেও নির্মিয়মান দুর্গাপ্রতিমা ভাঙচুর করা হয়েছে। এমনকি এখানকার সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছে দুষ্কৃতিরা। সবমিলিয়ে মুহাম্মদ ইউনূসের আশ্বাস যে কতটা মিথ্যা ছিল, ফের একবার প্রমান হল বাংলাদেশে।
স্বাধীনতার পর থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে মহা ধুমধাম করেই দুর্গাপুজোর আয়োজন করতেন সে দেশের সংখ্যালঘু হিন্দুরা। কার্যত সব সম্প্রদায়ের মানুষজনই দুর্গোৎসবে মেতে উঠতেন। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা সেজে উঠতো বাহারি রঙিন আলোয়। প্রতিমা দর্শনে ভিড়ও হতো প্রচুর। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে গত বছর গণঅভ্যুত্থানের জেরে শেখ হাসিনার আওযামী লীগ সরকারের পতন হওয়ার পর। ২০২৪ সালের দুর্গাপুজোর আগে কয়েকটি ইসলামিক কট্টরপন্থী সংগঠন নানান ফতোয়া জারি করে একটা ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করে। পাশাপাশি কয়েকটি দুর্গামণ্ডপ ভাঙচুর করেও তাণ্ডব চালানো হয়েছিল। যা নিয়ে ভারত সরকারও প্রতিবাদ জানায়। বিতর্কের আবহে ময়দানে নামতে বাধ্য হয়েছিলেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। পরে কড়া নিরাপত্তার আবহে নমো নমো করে পুজো সেরেছিলেন হিন্দু সমাজের লোকজন। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর অত্যাচার ও হামলার ঘটনা নিয়ে এবার বিশ্বের বহু দেশ সরব হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে ব্রিটেনও সমালোচনা করেছে ইউনূস সরকারের। কার্যত তাঁরা ভারতের দাবিকেই মান্যতা দিয়েছিল। ফলে চাপে পড়ে এবার অনেক আগে থেকেই ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছিল ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কিন্তু গোল বাঁধে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গির আলম চৌধুরীর এক মন্তব্যে। তিনি দাবি করেছিলেন, দুর্গাপুজোয় শুধু মদ-গাঁজা খাওয়া হয়। তাই মণ্ডপের বাইরে কোনও মেলা বসতে দেওয়া হবে না। এটা নিয়েও প্রবল প্রতিবাদ জানায় বাংলাদেশের জাতীয় হিন্দু মহাজোট এবং হিন্দু, খ্রীষ্টান, বৌদ্ধ ঐক্য জোট। চাপে পড়ে মুহাম্মদ ইউনূস ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ঢাকেশ্বরী মন্দিরে পুজোর প্র্স্তুতি বৈঠক করেন এই সংগঠনগুলির সঙ্গে। কিন্তু তাতেও ঠেকানো যায়নি প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা।
বাংলাদেশের পুজোমণ্ডপগুলির নিরাপত্তায় পর্যাপ্ত সিসিটিভি লাগানো, পুলিশ ও সেনার পর্যাপ্ত প্রহরা ছাড়াও একাধিক পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এমনকি মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে দুর্গাপুজোর অষ্টমী, নবমী ও দশমী তিন দিন সরকারি ছুটি দেওয়ার দাবিও জানিয়েছিল হিন্দু মহাজোট। এছাড়া নিরাপত্তা জোরদার করারপাশাপাশি কেন্দ্রীয়ভাবে একটি মনিটারিং সেল গঠন করার দাবিও জানিয়েছে তারা। এরমধ্যেই ঘটে গেল ঘৃণ্য ঘটনা। কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলায় একটিও মন্দিরে দুর্গাপ্রতিমা ভাঙচুর করা হল। ঘটনার পরই স্থানীয় জেলা প্রশাসন, পুলিশ, র্যাব, সেনাবাহিনীর সদস্য ছাড়াও রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তাঁরা প্রত্যেকেই দুর্গাপুজোর সময় আরও নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু তা বলে ওই এলাকার হিন্দুরা আস্বস্ত হতে পারছেন না। তাঁদের বক্তব্য, আমরা এমনিতেই আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি।
ঘটনার পরই কিছু মুসলিম সংগঠনের স্থানীয় কিছু নেতা ওই মন্দিরে যান। তাঁরাও প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, ইসলাম এই ধরণের ঘটনাকে সমর্থন করে না। যারা এই কাজ করেছে, তাঁদের চিহ্নিত করে শাস্তির ব্যবস্থা করুক প্রশাসন।
জানা যাচ্ছে, এই দুটি ঘটনার পর প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গেলেও এখনও পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি ইউনূসের প্রশাসন। যা নিয়ে একদিকে যেমন ক্ষোভ বাড়ছে, তেমনই আতঙ্কের পরিবেশ ছড়িয়ে পড়ছে গোটা বাংলাদেশে। হিন্দুদের সংগঠনগুলি বলছে, মুহাম্মদ ইউনূসের আশ্বাসবাণী যে ফাঁকা আওয়াজ তা আবারও প্রমাণিত হল। বাংলাদেশ ক্রমশ মৌলবাদী শক্তির হাতে চলে যাচ্ছে এবং তাতে মদত দিচ্ছেন স্বয়ং ইউনূস সাহেব এটাও প্রমাণিত হচ্ছে।












Discussion about this post