হাতিয়ার মাত্র পাঁচ দিন, বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচন ছাড়াও গণভোট হবে। এত গুরুত্বপূর্ণ দুটি নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলাদেশ নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ইনকিলাব মঞ্চের নেতা প্রয়াত ওসমান হাদীর সমর্থকরা কার্যত ঢাকার রাজপথের দখল নিয়েছে। তারা প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার দখল নেওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন। পথে স্বাভাবিকভাবেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাঁদের প্রতিরোধ করে, শুরু হয় এক প্রত্যাশিত গোলমাল। শুক্রবার দিনভর এবং রাত পর্যন্ত যা চলল। ফলে বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচনের আগে ফের উত্তপ্ত হল রাজধানী ঢাকা।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই বাংলাদেশের অন্তবর্তী সরকারের প্রধান মুহম্মদ ইউনূসের বাসভবন যমুনার বাইরে বিক্ষোভে শামিল হলেন কয়েকশো সরকারি কর্মীরা। পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সেখানে মোতায়েন করা হয়েছে বিশাল পুলিশ বাহিনী। জানা যাচ্ছে, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী। এখানেই শেষ নয়, তরুণ ছাত্রনেতা ওসমান হাদির খুনের বিচার চেয়েও ইনকিলাব মঞ্চরের কয়েক হাজার সমর্থক ঢাকার রাস্তায় নামেন। অভিযোগ, বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাঁদানে গ্যাসের সেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে। পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে অনেকে আহত হয়েছেন। যা নিয়ে জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে বাংলাদেশজুড়ে। এই পরিস্থিতিতে নানা দাবি, পাল্টা দাবি করা হচ্ছে। ঘটনাচক্রে শহীদ হিসেবে প্রতিপন্ন করা বাংলাদেশের চরমপন্থী ছাত্রনেতা শরীফ ওসমান হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার সামনে ইনকিলাব মঞ্চের বিক্ষোভ ও পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়েছে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো ধরনের গুলি ছোড়েনি এবং এ ঘটনায় আহতদের কারো শরীরে গুলির আঘাত নেই। যা নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতর।
প্রশ্ন উঠছে, যাকে শহীদের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, যাকে প্রভূত সম্মান দিয়ে কবর দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের কবরের পাশে। সেই ওসমান হাদির দাদাকে ব্রিটেনে বাংলাদেশ হাইকমিশনে চাকরি দেওয়ার পাশাপাশি তাঁর স্ত্রীকে এক কোটি টাকা ও ফ্ল্যাট দেওয়া হয়েছে। আচমকা কেন তাঁর বিচার চেয়ে পথে নামলো জামাতপন্থী ইনকিলাব মঞ্চ? এর পিছনে কোনও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে? ওসমান হাদি এখন বাংলাদেশে শহীদের মর্যাদা পাচ্ছেন। তাঁর মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয় শোক পর্যন্ত ঘোষণা করেছিল বাংলাদেশের অন্তরবর্তী সরকার। তাহলে কেন হাদির সমর্থকরা রাজপথে নেমে প্রতিবাদ করছে? এটা পরিকল্পিত ঘটনা নয় তো?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন ভিন্ন ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনির্বাচিত ইউনূস সরকার যা যা করছে তাতে কার্যত সায় দিচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলি। ওয়াকিবহাল মহলের একটা বড় অংশের দাবি, মুহাম্মদ ইউনূস চাইছেন তিনি নিজেকে বাংলাদেশে স্থায়ী কোনও বন্দোবস্তের মাধ্যমে আরও কয়েকটা বছর রেখে দেবেন। এর জন্য তাঁর প্রয়োজন গণভোটে বিপুল পরিমানে “হ্যাঁ” সূচক ভোট পড়ুক। সেই চেষ্টা তিনি করছেন। কিন্তু একটা সন্দেহ তৈরি হয়েছে আওয়ামী লীগের নেত্রী শেখ হাসিনার তরফে এই ভোট বয়কটের ডাক দেওয়ার পর। ফলে অনিশ্চিয়তা একটা আছে। এই পরিস্থিতিতে ভোটের আগে গোলমাল পাকিয়ে ভোট বানচালের একটা প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে বাংলাদেশে। তাই রাজধানী ঢাকা ও কয়েকটি বড় শহর নতুন করে উত্তাল হতে শুরু করল। বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, ভিড় নিয়ন্ত্রণ করতে পুলিশ ও অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী লাঠিচার্জ করছে, কাঁদানে গ্যাসের সেল ফাটাচ্ছে। তবুও ইউনূস সরকার বিবৃতি দিয়ে বলছে এমন কোনও ঘটনা ঘটেনি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের মতে, আসন্ন নির্বাচন নিয়ে এখনও অনিশ্চিয়তা কাটেনি। যে কোনও মুহূর্তে বাংলাদেশ আরও অশান্ত হতে পারে। যে দাবি ঢাকার মার্কিন দূতাবাসও করেছে তাঁদের দেশের নাগরিকদের উদ্দেশ্যে জারি করা ট্রাভেল অ্যাডভাইসারিতে। কারণ, কূটনৈতিক মহলও মনে করছে, বাংলাদেশের সমস্যার সমাধান নির্বাচনের পরও হবে না। কারণ, ইউনূস ও তাঁর অন্তর্বর্তী সরকার, অন্যদিকে জামাত-এনসিপি জোট চাইছে আরও মাস ছয়েক বাংলাদেশে এই অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থাই থাকুক। সেই কারণেই গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে, আবার একটা অশান্তি সৃষ্টি করে ভোট বানচালের চেষ্টাও চলছে।












Discussion about this post