বাংলাদেশে নির্বাচন হয়ে গিয়েছে। বিএনপি জয়ী হয়েছে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী পদে শপথ নিয়েছেন। গঠিত হয়েছে মন্ত্রিসভা। প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে জামায়াত। সাদা চোখে বিষয়গুলি দেখলে কিছুটা হলেও স্বাভাবিক ঘটনা বলে মনে হবে। কিন্তু রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীতে এটা একাবারে সাদা নয়, বরং বর্ণিল। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশকে কে নিয়ন্ত্রণ করবে এই নিয়ে তিনটি বৃহৎ রাষ্ট্র – ভারত, চিন এবং আমেরিকার মধ্যে শুরু হয়েছে এক অদৃশ্য ক্ষমতার খেলা। বাংলাদেশ আকার আয়তনে ভারতের মতো বৃহৎ রাষ্ট্র নয়। কিন্তু ভূরাজনৈতিক দিক থেকে দেশটি গুরুত্ব অপরীসীম। দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রে বাংলাদেশ নিছক একটি রাষ্ট্র নয়, বঙ্গোপসাগরের প্রবেশদ্বার। ভারতের চিকেন নেক বা শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তা বলয়ে অবস্থিত একটি দেশ এবং ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্র্যাটেজিক কৌশলে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গত কয়েক মাসে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের আন্তর্জাতিকমহল সুতীক্ষ্ণ নজর রেখেছিল। কোনও কোনও শক্তি ভেবেছিল এবং নিশ্চিত ছিল জামায়াত ক্ষমতায় আসছে। ভোটের আগে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের উচ্চস্তরীয় প্রতিনিধিরা জামাতের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যে ফলাফল সামনে এলো, তা তাদের পূর্বাভাসের ঠিক উল্টো। কেন মেলেনি? এর পিছনে কোন কৌশল কাজ করেছে? রাজনীতির দাবাখেলায় কার কৌশল ব্যর্থ হল বা কে জয়ী হল? ভারত-চিন-আমেরিকার ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বে আসলে জয়ী হল কে? বাংলাদেশে কারা ক্ষমতা আসবে, সেটা যেমন চিনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সমান গুরুত্বপূর্ণ আমেরিকা ও ভারতের কাছেও।
বাংলাদেশ আকার ও আয়তনে ছোট্ট একটি দেশ হলেও ভূরাজনৈতিক দিক থেকে দেশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের উপকূল বঙ্গোপসাগরের উত্তরপ্রান্তে। আর এখান দিয়েই মধ্যপ্রাচ্য থেকে পূর্ব এশিয়ায় জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন হয়। তাছাড়া চট্টগ্রাম ও মোংলাবন্দর ভারতের উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিতে ঢোকার জন্য বিকল্প প্রবেশপথ। অন্যদিকে, ভারতের মূল ভূখণ্ডকে উত্তর-পূর্বের রাজ্যে সঙ্গে যুক্ত রাখে যে সরু স্থলপথ, যাকে চিকেন নেক বলা হয় – এই চিকেন নেকের পাশেই বাংলাদেশ। তাই, বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা বিদেশি শক্তির উপস্থিতি ভারতের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
এদিকে, বাংলাদেশে সামরিক পরিকাঠামো এবং সামরিক খাতে চিন মোটা উয়ান বিনিয়োগ করেছে। লালমণির হাটে বিমানবন্দর, মোংলা এয়ারপোর্ট ডেভেলপমেন্টে চিন বিনিয়োগ করেছে। আবার আমেরিকা বঙ্গোপসাগরে তাদের উপস্থিতির জন্য সেন মার্টিন দ্বীপ দখল করতে চায়। হাসিনার আমলে তারা ওই দ্বীপ দখল নেওয়ার চেষ্টা চালায়। বঙ্গবন্ধু কন্যার ওপর তারা রীতিমতো চাপ তৈরি করে। কিন্তু হাসিনা সেই চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে অস্বীকার করেন। বলা হচ্ছে হাসিনার সেই অনমনীয় মনোভাবের জন্য তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। অপারেশন “সিন্দুর”-য়ে পাকিস্তানকে ভারত যেভাবে দুরমুশ করেছে তাতে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতে ক্রমবর্ধমান সামরিক সক্ষমতা নিয়ে আমেরিকা ও চিন দুজনেই অস্বস্তিতে পড়েছে। কারণ, অপারেশন “সিন্দুর”—য়ের পর ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় একটি সামরিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই প্রেক্ষাপটে একদিকে আরব সাগর, অপরদিকে বঙ্গোপসাগরে প্রভাব বাড়ছিল। পাশাপাশি ভারত ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন- বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে ইন্দো প্যাসেফিক অঞ্চলে তাদের সামরিক শক্তি ক্রমেই বাড়িয়ে চলছিল। আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে ভারত একটি সামরিক ঘাঁটি তৈরি করে মালাক্কা প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল। অপর দিকে, গোটা ভারত মহাসাগর জুড়ে সাউথব্লক তাদের সামরিক প্রভাব বাড়িয়ে তোলার চেষ্টা করে। এখন ভারত মহাসাগর এবং ইন্দোপ্যাসেফিক অঞ্চলকে ঘিরে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা দীর্ঘদিনের। ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিস্তারে আমেরিকা ও চিন রীতিমতো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে ভারত মহাসাগর এবং বঙ্গোপসাগরে ভারতের এই অগ্রযাত্রাকে সীমিত রাখার জন্য আমেরিকা যে কোনও মূল্যে বাংলাদেশকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়।












Discussion about this post