বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের দূরবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তাঁরা চেষ্টা করলেও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করতে পারছে না। মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার এবং তাঁর প্রেস উইং যা বলে দিচ্ছে, তার চেয়ে একলাইন বেশি কিছু লিখতেই পারছে না সংবাদমাধ্যমগুলি। এমনকি হেডলাইনেও দেখা যাচ্ছে, প্রায় সব সংবাদমাধ্যমেই এক ছাপা হচ্ছে। এটা খুবই আশ্চর্যের, যা গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ হিসেবেই দেখা উচিৎ। অবশ্যই ব্যতিক্রমী সংবাদমাধ্যম কয়েকটি রয়েছে। যারা এখনও সঠিক খবর প্রকাশের সাহস দেখাচ্ছে। সম্প্রতি সে দেশের গণমাধ্যমগুলিতে একটা সংবাদ এসেছে, চিন নাকি বাংলাদেশকে বিনামূল্যে ২০টি রেল ইঞ্জিন দিচ্ছে। মজার বিষয় হল, এই খবরটির ক্ষেত্রে হেডলাইন বা শিরোনাম এবং ভিতরের খবরের মধ্যে কোনও মিল নেই। হেডলাইনে গর্বের সঙ্গে বলা হচ্ছে, চিন ২০টি লোকোমোটিভ বাংলাদেশকে বিনামূল্যে দিচ্ছে। আর ভিতরে লেখা হচ্ছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ২০টি লোকোমোটিভ কেনার সহায়তা হিসেবে ১২৯ কোটি ৫৪ লক্ষ ডলার, বাংলাদেশের মুদ্রায় যা ১ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা অনুদান দিচ্ছে চিন। পুরো প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা, এর মধ্যে চিন দেবে ১ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা আর বাকি ৪৪ কোটি টাকা খরচ করবে বাংলাদেশ সরকার। তাহলে হেডলাইনগুলিতে কেন বিনামূল্যে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে? সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, চিনের এই লোকোমোটিভ কেনার পরিকল্পনায় বড় ঘাপলা বা দুর্নীতি হচ্ছে। যা ঢাকার জন্যই বাজারে বিনামূল্যে পাওয়ার গল্প ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। আসুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের এই ঘাপলা আসলে কিভাবে হচ্ছে।
আপনাদের নিশ্চই মনে আছে ২০২০ সালে ভারতীয় রেল বাংলাদেশকে বিনামূল্যেই উপহার স্বরূপ ১০টি ব্রডগেজ ডিজেল লোকোমোটিভ উপহার দিয়েছিল। এরপর ২০২৩ সালে বাংলাদেশকে আরও ২০টি রেলইঞ্জিন উপহার স্বরূপ পাঠায় ভারতীয় রেল। পরে আরও কয়েকটি ডিজেল লোকোমোটিভ দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তার আগেই হাসিনা সরকারের পতন হয়। উল্লেখ্য, ভারতের উপহার দেওয়া ৩০টি রেলইঞ্জিন বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলে দাপিয়ে সার্ভিস দিয়ে চলছে। জানা গিয়েছে ভারতের থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া এসব ইঞ্জিন গড়ে ৮ বছরের পুরোনো। এক একটা ডিজেল ইঞ্জিনের সাধারণ মেয়াদকাল ২০ বছর। বাংলাদেশে যেগুলি সার্ভিসিং করিয়ে কমপক্ষে ৩০/৩৫ বছরও ব্যবহার করতে পারবে। সবচেয়ে বড় বিষয়, এই ৩০টি রেল ইঞ্জিনের জন্য বাংলাদেশকে একটি টাকাও খরচ করতে হয়নি। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, চিন যদি বাংলাদেশকে বিনামুল্যেই রেল ইঞ্জিন দিতে চায়, তবে তাদের ব্যবহৃত পুরাতন ইঞ্জিন দিলেও পারতো। কারণ বাংলাদেশের এখন জরুরি ভিত্তিতে মিটারগেজ রেল ইঞ্জিনের প্রয়োজন। কিন্তু বিনামূল্যে পাওয়া জিনিসে তো আর ঘাপলা বা দুর্নীতি করা যায় না। এ ক্ষেত্রে কি ঘাপলা হচ্ছে, সেই বিষয়ে আসি।
এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক বা এডিবির অর্থায়নে দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পে শেখ হাসিনা সরকার ৬ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা সাশ্রয় করেছিল। সেই অর্থ সংযুক্ত করে নতুন একটা প্রকল্প চালু করেছিলেন শেথ হাসিনা। সেটি হল দোহাজারী-চট্টগ্রাম ডুয়েলগেজ রেললাইন স্থাপন ও নতুন ইঞ্জিন সংগ্রহ। এই প্রকল্পের আওতায় তৎকালীন হাসিন সরকার ১৫০০ কোটি টাকায় দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেম কোম্পানি থেকে ৩০টি নতুন মিটারগেজ রেল ইঞ্জিন কেনার জন্য অনেকদূর এগিয়েছিল। কিন্তু গত বছরের ৫ই আগস্ট সরকার পরিবর্তন হলে সেই প্রকল্প ইউনূস সরকার বাতিল করে। এরপর নতুন করে ২০টি রেল ইঞ্জিন কেনার জন্য চিনের কাছে হাত পাতে ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। চিনও রাজি হয় সাহায্য করতে। এই আবহে বাংলা্দেশ রেলওয়ে এখন টেন্ডার আহবান করছে। চিন অনুদান দিচ্ছে, সেহেতু চিন থেকেই এই ইঞ্জিন কিনতে হবে। শর্ত একটাই চিন থেকেই কিনতেই হবে। আসল খেলাটা এখানেই। ১৫০০ কোটি টাকায় কোরিয়া থেকে যেখানে ৩০টি হুন্দাই রোটেমের রেল ইঞ্জিন পাওয়া যাচ্ছিল, সেখানে এখন ১৬৩৫ কোটি টাকায় চিনা ইঞ্জিন কেনা হবে। যেখানে প্রতিটি কোরিয়ান ইঞ্জিনের দাম পড়ত কমবেশি ৩০ কোটি টাকা করে, সেখানের চিনা রেল ইঞ্জিন কিনতে হবে কম করে ৮০ কোটি টাকা খরচ করে। ইঞ্জিনপ্রতি কত কোটি টাকা চুরির ব্যবস্থা করা হয়েছে। কারা কারা এই টাকার ভাগ পাবেন সেটা না বললেও চলে। আসলে দেশের জনগণকে ভুল বোঝাতে, ধোঁকা দিতে বিনামূল্যে রেল ইঞ্জিন পাওয়ার কথা বলা হচ্ছে। আর ভিতরে ভিতরে কয়েকশো কোটি টাকা ঘাপলা করে নিজেদের পকেট ভরাতে উদ্যোগী অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা। এটাই ইউনূসের বাংলাদেশ।












Discussion about this post