আতঙ্কে এবার সাগরে। একই সময়ে দুই সাগরে- বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগর। দুটি ঘটনাই কমবেশি আতঙ্ক তৈরি করেছে। বঙ্গোপসাগরে ঘটনাটি ঘটেছে গত শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, বিকেলে। ফুকেটের লায়েম প্রোমথেক এলাকা থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে ‘সিলয়েড আর্ক’ নামে একটি তৈলবাহী জাহাজ ডুবে গিয়েছে। জাহাজে থাকা ১৬ জন ক্রুকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। অপরদিকে, মুম্বইয়ের কাছে সমুদ্রপথে আন্তর্জাতিক তেল পাচারচক্রের পর্দা ফাঁস করল ভারতীয় উপকূলরক্ষী বাহিনী। অভিযান চলে ৫ থেকে ৬ ফেব্রুয়ারি। একই সঙ্গে সমুদ্র ও আকাশপথে অভিযান চলে। সরকারি সূত্রে খবর, তিনটি জাহাজকে আটক করা হয়েছে। ভারতীয় উপকূলরক্ষী বাহিনী সূত্রে পাওয়া খবরে জানা গিয়েছে, উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থায় ভারতের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন –য়ের মধ্যে সন্দেহজনক গতিবিধি ধরা পড়ে। তাঁর ভিত্তিতে মুম্বই থেকে প্রায় ১০০ নটিক্যাল মাইল পশ্চিমে তিনটি জাহাজকে চিহ্নিত ও আটক করা হয়। ভারতীয় উপকূলরক্ষী বাহিনীর সন্দেহ আন্তর্জাতিক জল সীমায় জাহাজ থেকে জাহাজে (ship to ship) তেল স্থানান্তরে জড়িত ছিল।
তেলবাহী জাহাজের ডুবে যাওয়া ঘটনাটি বেশ আতঙ্কের। দুর্ঘটনাটি ঘটে আন্দামান সাগরে। জাহাজটি মায়ানমার থেকে বাংলাদেশ যাচ্ছিল। ছিল ২৯৭টি কন্টেইনার। যাচ্ছিল বাংলাদেশ। মাঝসমুদ্রে হঠাৎ জাহাজের মধ্যে জল ঢুকতে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে জাহাজ তলিয়ে যায়। দুর্ঘটনার পর থাইল্যান্ডের নৌ এবং উদ্ধারকারী বাহিনী দ্রুত অভিযান চালিয়ে ক্রুদের উদ্ধার করে। তাদের মধ্যে কোনও বাংলাদেশি নাগরিক আছে কি না, তা তারা খুঁজে দেখছে। তবে আতঙ্কের বিষয়টি হল সমুদ্রের প্রায় ৪ দশমিক ৫ মাইল দীর্ঘ ও এক মাইল প্রশস্ত এলাকা জুড়ে তেল ছড়িয়ে পড়েছে। তৈরি করেছে মোটা আস্তরণ। ২৯৭টি কন্টেইনারের মধ্যে ১৪চি তে ছিল বিষাক্ত রাসায়নিক। পরিস্থিতিকে ‘‘বৃহৎ সংকট’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে থাই কর্তৃপক্ষ। পরিবেশগত বিপর্যয় রোধ করতে দুর্ঘটনার পরের দিন একটি কেন্দ্রীয় কম্যান্ড তৈরি করা হয়েছে। আকাশপথে সমীক্ষা চালিয়ে তেলের আস্তরণ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। যদিও এখনও পর্যন্ত ফুকেটের মূল উপকূল রেখায় তেল পৌঁছানোর খবর পাওয়া যায়নি। তবে সাগরের রাসায়নিক মিশ্রিত কন্টেইনারগুলি সামুদ্রিক জীব বৈচিত্র্যের জন্য চরম হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশগামী জাহাজটিতে আমদানিকৃত বিভিন্ন পণ্য থাকায় দেশের বাজারে এর প্রভাব পড়তে পারে কি না, তা জানতে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে, তেল ও রাসায়নিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে থাই কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন সংস্থা যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান ও সমুদ্র পরিষ্কার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
মুম্বইয়ের ঘটনা প্রসঙ্গে ভারতীয় উপকূলরক্ষী বাহিনীর এক কর্তা জানিয়েছেন, “ “ডিজিটাল নজরদারি ও ডেটা-প্যাটার্ন বিশ্লেষণে সমুদ্রে জাহাজগুলির অস্বাভাবিক চলাচল ও একত্র হওয়া ধরা পড়ে। সেই ইনপুটের ভিত্তিতে দ্রুত কোস্ট গার্ডের জাহাজ ও বিমান মোতায়েন করা হয়।” ৫ ফেব্রুয়ারি বিশেষজ্ঞ বোর্ডিং টিম জাহাজগুলিতে উঠে দীর্ঘ তল্লাশি চালায়। জাহাজে পাওয়া ইলেকট্রনিক তথ্য, নথিপত্র যাচাই এবং নাবিকদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে গোটা পাচারচক্রের কার্যপদ্ধতি স্পষ্ট হয় বলে দাবি তদন্তকারীদের। আধিকারিকরা নিশ্চিত করেছেন, একাধিক দেশের ‘হ্যান্ডলার’-দের জড়িত রেখে এই পাচারচক্র সমন্বিত ভাবে কাজ করছিল। প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, সমুদ্রগামী জাহাজে সস্তা তেল এনে আন্তর্জাতিক জলসীমায় মোটর ট্যাঙ্কারে স্থানান্তর করা হত। এভাবে পণ্যের উৎস গোপন রেখে উপকূলবর্তী দেশগুলির প্রাপ্য শুল্ক এড়ানো হতো – যার মধ্যে ভারতও রয়েছে। ” এক আধিকারিকের কথায়, এটি অত্যন্ত সুচিন্তিত ও প্রযুক্তি নির্ভর পদ্ধতি। কোস্ট গার্ডের বিশেষ প্রশিক্ষিত বোর্ডিং দল জাহাজে তল্লাশি চালিয়ে ইলেকট্রনিক তথ্য সংগ্রহ করে, নথিপত্র যাচাই করে এবং নাবিকদের জিজ্ঞাসাবাদ করে পুরো চক্রের কার্যপদ্ধতি স্পষ্ট করে। এতে নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি একটি সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক পাচার নেটওয়ার্ক, যেখানে একাধিক দেশের হ্যান্ডলাররা সমন্বয় করে মাঝসমুদ্রে তেল বিক্রি ও স্থানান্তরের কাজ চালাত। অভিযানকারীরা মনে করছেন, এই চক্র ভাঙার ফলে সমুদ্রপথে বেআইনি তেল বাণিজ্য বড় ধাক্কা খাবে। তদন্ত প্রক্রিয়া চলবে আরও বেশ কয়েকদিন। আধিকারিকদের মতে, এই সফল অভিযান আন্তঃদেশীয় সামুদ্রিক অপরাধ দমনে ভারতের দৃঢ় অবস্থানকে আরও জোরালো করল। একই সঙ্গে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ‘নেট সিকিউরিটি প্রোভাইডার’ হিসেবে ভারতের ভূমিকা ও নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক শৃঙ্খলা রক্ষার প্রতিশ্রুতি আবারও প্রতিষ্ঠিত হল।












Discussion about this post