বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। জানা যাচ্ছে, সেই আলোচনায় বাংলাদেশের সংস্কার, নির্বাচন, শুল্কনীতি, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য সহায়তা ও ইন্দো-প্যাসিফিক আঞ্চলের নিরাপত্তা ইস্যু গুরুত্ব পেয়েছে। মার্কিন ডিপার্টমেন্ট অফ স্টেটসের ওয়েবসাইটে এই তথ্য দেওয়া হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট করে কোনও বিষয়ের উল্লেখ নেই সেই তথ্যে। অপরদিকে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিবৃতিতেও নির্দিষ্টি কি কি আলোচনা হয়েছে দুজনের সে কথা জানানো হয়নি। ফলে এই ফোনালাপ নিয়ে জোরদার চর্চা শুরু হয়েছে বাংলাদেশে। বিশেষ করে বাংলাদেশ প্রশাসনের এই রাখঢাক-গুড়গুড় করাকেই সন্দেহের চোখে দেখছেন রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহল। কেউ কেউ মনে করছেন, মূলত রাখাইন করিডের নিয়ে সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতেই মুহাম্মদ ইউনূসকে ফোন করেছিলেন মার্কো রুবিও। কারণ, এই মুহূর্তে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে চিন প্রবল চিন্তায়। যদি বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিন বা কক্সবাজারে রাখাইন মানবিক করিডোরের আড়ালে মার্কিন সেনা ঘাঁটি তৈরি হয়ে যায়, তাহলে সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে পড়বে বেজিংই। যা তাঁদের নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যপথের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। ফলে বেজিং কোনও মতেই চাইবে না, ইউনূস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে বেশি মাত্রায় ঝুঁকে থাকুন। জানা যাচ্ছে, বেজিং এবার আসরে নেমেছে বাংলাদেশ নিয়ে। আর তাতেই প্রবল অস্বস্তিতে পড়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কো রুবিও সেই কারণেই প্রধান উপদেষ্টাকে সরাসরি ফোন করে খোঁজখবর নিয়েছেন। আরও একটি বিষয় রয়েছে, সেটা হল বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য নিয়ে যে অচলবস্থা তৈরি হয়েছে, সেটা নিয়েও কথা হতে পারে দুই শীর্ষ নেতার। বিশেষ করে দুই নেতা এমন এক সময় টেলিফোনে কথা বললেন যখন শুল্ক চুক্তি-সহ বেশ কিছু বিষয়ে আলোচনা করতে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছেন, মার্কো রুবিও এবং মুহাম্মদ ইউনূসের মধ্যে ফোনালাপটি প্রায় ১৫ মিনিট স্থায়ী ছিল। অত্যন্ত উষ্ণ, সৌহার্দ্যপূর্ণ এবং গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে তাদের মধ্যে। যা দুই দেশের মধ্যকার চমৎকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রতিফলন। যদিও বাংলাদেশের বিশ্লেষকরা দাবি করছেন, শফিকুল আলম বেশিরভাগ সময়ই বাড়িয়ে কথা বলেন। মাত্র ১৫ মিনিটের বার্তালাপে কতটা গঠনমূলক আলোচনা হতে পারে, উঠছে প্রশ্ন। তবে যে প্রশ্নটা সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে, সেটা হল, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী কেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানের সঙ্গে আলোচনা করতে যাবেন? কেউ কেউ বলছেন, এটা আসলে রাখাইন করিডোর মামলা। এই করিডোরের আড়ালে যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি তৈরির ষড়যন্ত্র চলছে, তা আসলে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসগরের ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার বিষয়। সেই কারণেই মার্কো রুবিও ফোন করেছিলেন মুহাম্মদ ইউনূসকে।
অন্যদিকে বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকা দাবি করছে, পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির নির্ধারিত সময়সীমা যত ঘনিয়ে আসছে, ততই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে চুক্তির মূল শর্তাবলী নিয়ে মতপার্থক্য থেকে যাচ্ছে। রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ এগ্রিমেন্ট শীর্ষক এই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র এমন কিছু শর্তারোপ করেছে, যা প্রচলিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চর্চা ও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য নয় বলেই মনে করছে বাংলাদেশ। গত ২৬ জুন ওয়াশিংটনে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে এই মতপার্থক্য প্রকাশ্যে আসে। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খালিলুর রহমান যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসটিআর কর্মকর্তাদের দেওয়া খসড়া চুক্তির প্রস্তাবের বিপরীতে পাল্টা প্রস্তাব দেন। সূত্রের খবর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসটিআর বাংলাদেশের পাল্টা প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে ইন্দো-বাংলাদেশ বাণিজ্যিক চুক্তি এখন বিশ বাও জলে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যদি দুই দেশের বাণিজ্য চুক্তি না হয়, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও তলিয়ে যাবে। কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশি পণ্যের ওপর বাড়তি ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিলেন। যা এখন স্থগিত রয়েছে। কিন্তু সময়মতো চুক্তি না হলে বাংলাদেশকে সবমিলিয়ে ৫২ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে মার্কিন মূলুকে বাণিজ্য করতে হলে। সবমিলিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে এখন বিপদের মুখে মুহাম্মদ ইউনূস, এমনও হতে পারে, অতি লোভের কারণে তাঁর আমও যাবে, ছালাও যাবে।












Discussion about this post