শেখ হাসিনার মতোই গণঅভ্যুত্থানের জেরে ক্ষমতা হারিয়েছিলেন বিশ্বের বহু জনপ্রিয় অথবা কুখ্যাত নেতা। তবে বিশ্ব ইতিহাসে ক্ষমতাচ্যুত রাষ্ট্রপ্রধানের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড বিরল হলেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায়গুলোর একটি। কখনও সামরিক অভ্যুত্থান, কখনও গণবিপ্লব আবার কখনও গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ তাঁদের ক্ষমতাচ্যুত নেতাদের বিচারের মুখোমুখি করেছে। ইতিহাসে এর নজির বিরল নয়। সাম্প্রতিক সংযোজন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যেমন বিদেশে থাকাকালীন হাসিনার মতোই মৃত্যুদণ্ডের সাজা শুনতে হয়েছিল পাকিস্তানের প্রাক্তন সামরিক শাসক জেনারেল পারভেজ মুশারফকে। তবে তিনি জীবদ্দশায় আর পাকিস্তানে ফেরেননি, আর তাঁর সাজাও কার্যকর হয়নি। তবে ইতিহাসে এমন বহু নেতাই রয়েছেন যাদের কেউ আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন, কেউ আবার আত্মসমর্পণের পরমুহূর্তেই নিহত হয়েছেন। আসুন একবার ইতিহাসের পাতায় নজর দিয়ে দেখা যাক এমন কিছু নেতা তথা একনায়কের ক্ষমতাচ্যুতির পরের গল্প।
আমাদের পড়শি দেশ পাকিস্তানেই রয়েছে প্রাক্তন রাষ্ট্রনেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নজির। পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রতিষ্ঠাতা তথা পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকর আলি ভুট্টো। ১৯৭৭ সালের জুলাই মাসে তৎকালীন পাক সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউল হক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। কয়েকদিনের মধ্যেই তাঁকে গ্রেফতার করে শেখ হাসিনার মতোই বিরোধী রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের খুনের অভিযোগ আনা হয়। পিপিপি-র প্রতিষ্ঠাতা ভুট্টো সেই মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। ১৯৭৯ সালের ৪ এপ্রিল ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছিল পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জুলযফিকার আলী ভুট্টোকে। আর তা হয়েছিল তৎকালীন সেনা সরকারের তত্ত্বাবধানেই। যদিও পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ ২০২৪ সালে এক সর্বসম্মত রায়ে জানিয়েছিল, ন্যায়বিচার পাননি জুলফিকার আলী ভুট্টো। তাঁর বিচার ‘স্বচ্ছ ও যথাযথ আইনি পদ্ধতি’ মেনে হয়নি।
অন্যদিকে ১৯৯৯ সালে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নওয়াজ শরিফকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করেছিলেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল পারভেজ মুশারফ। এরপর ২০০১ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের ‘নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট’ ছিলেন তিনি। কিন্তু ২০০৮ সালে পাক পার্লমেন্টে আনা ইমপিচমেন্ট এড়াতে মুশারফ ইস্তফা দিয়ে দেশ ছেড়ে পালান। এর ১১ বছর পর ২০১৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে মুশারফের মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছিল পেশোয়ার হাইকোর্টের তিন বিচারপতির বেঞ্চ। যদিও তাঁর মৃত্যুদণ্ড আর কার্যকর হয়নি। শেষমেশ ২০২৩ সালে লন্ডন থেকে তাঁর কফিনবন্দি দেহ করাচি ফিরেছিল।
১৯৭৯ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ইরাকের শাসক ছিলেন সাদ্দাম হোসেন। তবে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আগ্রাসনের জেরে তাঁর ক্ষমতাচ্যুতি হয়। এরপর মানবতাবিরোধী অপরাধে তাঁকে ইরাকি ট্রাইব্যুনালে তাঁর বিচার চলে। ওই ট্রাইবুনালই সাদ্দাম হোসেনকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়। এরপর সাদ্দাম হোসেনকে ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। বলা হয় তাঁর মৃত্যুদণ্ড ছিল আধুনিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত বিচারগুলোর একটি। আবার লিবিয়ার দীর্ঘ ৪২ বছরের শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির নামও এই তালিকায় রাখা যায়। ২০১১ সালে এক গণবিদ্রোহে ক্ষমতা হারান কুখ্যাত এই একনায়ক। এমনকি আদালতের কোনও রায় ছাড়াই আটক হওয়ার পর মাঠেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করে এবং লিবিয়ায় বিভক্ত রাজনীতির সূচনা হয়। পাশাপাশি রুমানিয়ার কমিউনিস্ট নেতা নিকোলাই চশেস্কুর নামও উল্লেখ করা যায়। তিনি দীর্ঘ ২৪ বছর রুমানিয়া শাসন করেছিলেন। ১৯৮৯ সালে রুমানিয়ায় কমিউনিস্ট শাসনের পতনের সময় তাঁকে এবং তাঁর স্ত্রীকে সামরিক ট্রাইব্যুনালে দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করা হয়। এরপর ১৯৮৯ সালের বড়দিনে গণহত্যা ও অর্থনৈতিক ধ্বংসের অভিযোগে নিকোলাই চশেস্কুর ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছিল।
বাংলাদেশের ইতিহাসেও দুজনের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। যদিও আদালতে মৃত্যুদণ্ডের সাজা না হলেও তাঁদের হত্যা করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালে এই নভেম্বর মাসে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় জেলবন্দি প্রাক্তন কার্যনির্বাহী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ-সহ আওয়ামী লীগের চার নেতার হত্যা সে দেশের ইতিহাসে আজও জ্বল জ্বল করছে। এবার ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ফাঁসির আদেশ দিয়েছে ঢাকার আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনাল। যদিও এই দুজনেই এখন ভারতের আশ্রয়ে রয়েছেন। আর ভারত এই দুই নেতাকে বাংলাদেশের হাতে আদৌ তুলে দেবে কিনা সন্দেহ। ফলে তাঁদের ফাঁসি কার্যকর হবে কিনা সেটাই এখন প্রশ্ন।












Discussion about this post