বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান আরও একবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের নেপথ্যে তাঁর ভূমিকা, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনে তাঁর ভূমিকা এবং দেশের বিশৃঙ্খল ও অরাজক পরিস্থিতিতেও তাঁর চোখ বন্ধ করে রাখা নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে। কারণ, ২০২৪ সালের জুন মাসেই ওয়াকার উজ জমানকে সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর মাত্র দেড় মাসের মাথায় হাসিনাকেই সরাতে তিনি সক্রিয় হয়েছিলেন। অনেকেই দাবি করেছিলেন, আসলে গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতা এবং জামায়াতে ইসলামীকে সাহায্য করে তিনি আসলে ক্ষমতার কেন্দ্রে বসার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁর ক্ষমতায় আসার লোভ থাকলেও সাহস ছিল না। ফলে তিনি নিজের স্বপ্ন চেপে গিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হাতে ক্ষমতার হস্তান্তর করেন। ছয়মাসের মধ্যে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে বলেছিলেন জেনারেল ওয়াকার। কিন্তু সেই নির্বাচন হতে দেড় বছর গড়িয়ে যায়। তবে নির্বাচন হল, এবং তা অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবেই হল। ভোটের হারও বেশ ভালো। বলা হয়, সেনাবাহিনীর সক্রিয় ভূমিকায় গত ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের নির্বাচন ঠিকঠাক হয়। এই অবাধ নির্বাচন তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ সুগম হয়। ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে, এটা জেনারেল ওয়াকারের দ্বিতীয় জয়।
ঘটনা হল, বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে ব্যাপক রদবদল হয়েছে। কেউ কেউ দাবি করছেন, খাড়া ঝুলছিল জেনারেল ওয়াকারের উপরও। কিন্তু তা হয়নি। তবে যে রদবদল হল, তাতে ইউনূসের আমলে সেনার যে অংশটি একাধিকবার ক্যু করার চেষ্টা করেছিল, তাঁদের ধরে ধরে সরিয়ে দিয়েছে তারেক রহমানের সরকার। বলা হচ্ছে, এর পেছনে ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করেছে। প্রথমেই বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এসএম কামরুল হাসানের নাম। তিনি সরাসরি ইউনূসের অফিসে কাজ করতেন। এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে সমান্তরাল ক্ষমতা ভোগ করতেন। এই কামরুল হাসানকে বরাবরই পাকিস্তান সফরে দেখা গিয়েছে। এমনকি পাকিস্তানের সামরিক জেনারেলরা যখন ঢাকায় এসেছিলেন, তখনও কামরুল হাসানকে তাঁদের সঙ্গে আঠার মতো লেগে থাকতে দেখা গিয়েছে। তাঁকেই সেনাবাহিনী থেকে সরিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হল পররাষ্ট্র মন্ত্রকে। তাও আবার “অপেক্ষারত রাষ্ট্রদূত” হিসেবে।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল কামরুল হাসানের খুব ঘনিষ্ঠ খলিলুর রহমান। তিনি তারেক রহমানের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। অপরদিকে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের অনুগত জিওসি লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাইনুর রহমানকে জেনারেল স্টাফের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, এখানেও জিতে গেলেন জেনারেল ওয়াকার। ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ হাফিজুর রহমানকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে এবং তিনি এখন ৫৫তম পদাতিক ডিভিশনের নতুন জিওসি হবেন। তিনি পূর্বে নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে ছিলেন। সবমিলিয়ে যেটা বোঝা যাচ্ছে, তারেক রহমান ক্ষমতায় এসেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে জামাত ঘনিষ্টদের সরিয়ে দিলেন। সেই জায়গায় নিয়ে আসা হল জেনারেল ওয়াকার ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকা একাধিক সেনাকর্তাকে। এই রদবদলে বাংলাদেশের কৌশলগত কম্যান্ড থেকে গোয়েন্দা সংস্থা-সবেতেই প্রভাব পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।












Discussion about this post