অশান্ত বাংলাদেশ, গণঅভ্যুত্থানের দেড় বছরের মাথায় কার্যত আগুন জ্বলছে ভারতের পড়শি দেশে। উগ্র ভারত-বিরোধী, কট্টরপন্থী যুব নেতার মৃত্যু ঘিরে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক একেবারেই শেষবিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। এই পরিস্থিতির জন্য মুহাম্মদ ইউনূসকেই কাঠগড়ায় তুললেন শেষ হাসিনা। এক অডিও বার্তায় তিনি ফের দাবি করলেন, বাংলাদেশের বিদেশনীতি সম্পূর্ণভাবে মৌলবাদীদের হাতে চলে গিয়েছে। কট্টরপন্থীদের হাতে চলে গিয়েছে বাংলাদেশ, তাই ইউনূস সরকার ভারত বিরোধী স্লোগানে মুখর হয়ে উঠছে নব্য বাংলাদেশ। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উগ্বেগ ছড়িয়েছে নয়া দিল্লির সাউথ ব্লকেও। তবে বাংলাদেশ এবং শেখ হাসিনা ইস্যুতে ভারতের সব রাজনৈতিক দল দিল্লির পাশেই দাঁড়িয়েছে। এমনকি কয়েকটি মহল থেকে চাপ বৃদ্ধি হতে শুরু করেছে বাংলাদেশ নিয়ে এবার কঠোর কোনও পদক্ষেপ নেওয়ার।
বিষয়টি শুরু থেকেই শুরু করা যাক। গত বছর ৫ আগস্ট বাংলাদেশে এক তথাকথিত গণঅভ্যুত্থানের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোনও ভাবে ভারতে পালিয়ে আসেন। এরপর থেকে তিনি ভারতের রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় রয়েছেন, তবে তাঁর অবস্থান এখনও খোলসা করেনি ভারত। তিনি ভারতে বসেই সমাজমাধ্যমে প্রায় নিয়ম করে বিবৃতি দেন। তাঁর অডিও বার্তা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা নির্দেশনা বাংলাদেশে নতুন করে আওয়ামী লীগের সংগঠন গড়ে উঠেছে। এমনকি সেখানে রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ থাকা সত্বেও আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে ব্যপক সাড়া পড়ছে। এর জন্য ভারত সরকারকেই দায়ী করছে বাংলাদেশের মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার। তাঁরা ভারতকে বেশ কয়েকটি চিঠি বা নোট ভার্বাল দিয়েছে শেখ হাসিনাকে সমাজ মাধ্যমে বক্তব্য রাখা থেকে বিরত করার জন্য। কিন্তু ভারত সে কথায় কর্ণপাত করেনি। এমনকি ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে হাসিনার মৃত্যুদণ্ড হওয়ার পর তাঁর প্রত্যর্পণের জন্য একাধিক চিঠি এসেছে দিল্লিতে। কিন্তু ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী যতদিন ইচ্ছা ভারতে থাকবেন। বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের সমস্ত বিরোধী রাজনৈতিক দলও হাসিনার পাশে দাঁড়িয়েছে। এবং বাংলাদেশের বর্তমান অরাজকতার জন্য মুহাম্মদ ইউনূসকেই কাঠগড়ায় তুলছেন।
ভারতের সংসদীয় স্ট্যান্ডিং কমিটি অন এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্সের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিবেদন সম্প্রতি প্রকাশ হয়েছে। এই কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন কংগ্রেস নেতা তথা সাংসদ শশী থারুর। প্রতিবেদনে ভারত সরকারকে সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে ভারতের জন্য “সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ”। ভারতের সংসদীয় স্ট্যান্ডিং কমিটি অন এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্স জানিয়েছে, ইসলামি উগ্রবাদী শক্তির উত্থান, চীন ও পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্যের পতন—এসব মিলে বাংলাদেশে একটি সম্ভাব্য কৌশলগত পুনর্গঠনের দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে, যা নয়াদিল্লির নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগকে ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে তুলছে। এই কমিটির আরও পর্যবেক্ষণ, চিনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও গোয়েন্দা কার্যকলাপের ক্রমাগত বিস্তার, পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের ডিসইনফরমেশন নেটওয়ার্ক—এসব মিলে ঢাকায় ভারতের কৌশলগত স্থানকে হুমকির মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে মংলা বন্দরের ৩৭০ মিলিয়ন ডলারের সম্প্রসারণ প্রকল্পে চীনের সরাসরি জড়িত থাকা, লালমনিরহাট বিমানঘাঁটির উন্নয়ন এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে ভারতের সংসদীয় কমিটি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এর জন্য ভারত সরকারকে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের আর্জিও জানানো হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ট্র্যাক-টু আলোচনা চালানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ১৯৭১ সালের চ্যালেঞ্জ ছিল মূলত অস্তিত্বের। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানবিক সংকট থেকে একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্মের বিষয় ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি আরও সূক্ষ্ম ও দীর্ঘমেয়াদি। মূলত প্রজন্মগত বিচ্ছেদ, রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং ভারত থেকে দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আর এর পিছনে রয়েছে বিদেশী শক্তির ইন্ধন। ফলে ভারতকে বাংলাদেশ সম্পর্কে তাঁর কৌশল পুনর্গঠন করতে হবে। বিদেশনীতি এবং দেশীয় সংকটে ভারতের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি বরাবরই কেন্দ্রীয় সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছে। এবারও তার অন্যথা হল না। ফলে নরেন্দ্র মোদি অনেকটাই খোলা মনে বাংলাদেশ সম্পর্কে তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে পারবেন। কারণ, তাঁর উপর কড়া পদক্ষেপের আভ্যন্তরীণ চাপ বাড়ছে। সে দেশে হিন্দুদের উপর অত্যাচার ও খুনের ঘটনা বিজেপির অভ্যন্তরেও ক্ষোভ সৃষ্টি করছে। তাই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এবার আর চুপ থাকবে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
আবার বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছে ডিপ স্টেট। জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী পর্যায়ে হাসিনা সরকারের পতনের পর এসেছিল ডিপ স্টেটের...
Read more












Discussion about this post