‘গল্পটা সবাই জানে / কিন্তু সেই গল্পের ভিতরে /শুধুই প্রশস্তিবাক্য- উচ্চারক কিছু / আপাদমস্তক ভিতু, ফন্দিবাজ অথবা নির্বোধ /স্তাবক ছিল না/ একটি শিশুও ছিল। সত্যবাদী, সরল সাহসী একটি শিশু’ ।
বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে ইস্তক যাঁদের সম্পর্ক, তাঁরা সবাই জানেন এটা কোন কবিতার অংশ বিশেষ। তাও আরও একবার উল্লেখ করে দেওয়া যাক। এটি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর উলঙ্গ রাজা কবিতার অংশ। যে কবিতা শুরু হয়েছে এই ভাবে – ‘সবাই দেখছে যে, রাজা উলঙ্গ, তবুও / সবাই হাততালি দিচ্ছে। / সবাই চেঁচিয়ে বলছে; শাবাশ, শাবাশ !’ প্রতিবেদনের কেন্দ্রীয় চরিত্র কে হতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা যেতে পারে। অনেকদিন আগেই তিনি উলঙ্গ হয়েছিলেন। আসলে ‘কেউ ভাবছে রাজবস্ত্র সত্যিই অতীব সুক্ষ্ম / চোখে পড়ছে না যদিও, তবুও আছে, অন্তত থাকাটা কিছু অসম্ভব নয়। ’
যেটুকুও বা ছিল, মানে ওই কৌপিনটুকু, সেটা ছিঁড়ে তাঁকে ‘বাস্তবের প্রকাশ্য রাস্তায় ’ নামিয়ে এনেছেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। তাই, ‘আবার হাততালি উঠছে মুহুর্মুহু / জমে উঠেছে।’ এখন দরকার সেই শিশুটির। ‘সে এসে একবার এই উলঙ্গ রাজার সামনে / নির্ভয়ে দাঁড়াক। / এসে একবার এই হাততালির উর্ধ্বে গলা তুলে / জিজ্ঞাসা করুক : রাজা তোর কাপড় কোথায়?। ’
এই উলঙ্গ রাজা বাংলাদেশের তদারকি সরকার প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস। যেদিন বাংলাদেশের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক এএমএম নাসির উদ্দিন ভোট নির্ঘণ্ট ঘোষণা করলেন সেদিন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে। সেই সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতিকে বলতে শোনা যায়, ‘আই অ্যাম কিন টু লিভ। আই অ্যাম ইন্টারেস্টেড টু গো আউট। আনটিল ইলেকশন আর হেল্ড, আই সুড কন্টিনিউ। আই অ্যাম আপহোল্ডিং মাই পজিশন বিকজ অব দ্য কনস্টিটিউশন হেল্ড প্রেসিডেন্সি। ইফ দে টেলমি দে প্ল্যান টু চুজ দেয়ার ওন প্রেসিডেন্ট, আই উইল স্টেপ অ্যাসাইড।’
বাংলা তর্জমা করলে অনেকটা এরকম দাঁড়ায়, ‘রাষ্ট্রপতি পদে থাকার কোনও ইচ্ছে আমার নেই। আমি চলে যেতে চাই। কিন্তু নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত আমায় আমার দায়িত্ব পালন করতেই হবে। কারণ, সংবিধানের প্রতি আমি দায়বদ্ধ। ওরা যদি বলে, তারা নিজেরাই তাদের পছন্দ মতো রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবে, তাহলে আমি ইস্তফা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত।’
কবে এই সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে গত ১২ ডিসেম্বর। আর সেইদিন বাংলাদেশের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক নাসির উদ্দিন জাতীয় নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করেন। এটাকে কোনওভাবেই কাকতালীয় বা কো ইন্সিডেন্ট বলা যাবে না। যা কিছু হয়েছে, সেটা কিন্তু জ্ঞাতসারেই হয়েছে। হয়তো চুপ্পুর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল অনেকদিন আগে। কিন্তু প্রকাশ করা হল সুনির্দিষ্ট একটি দিনে। কিন্তু কেন?
রাষ্ট্রপতি সাহেবের এই সাক্ষাৎকার বলা যেতে পারে নিঃশব্দ গণঅভ্যুত্থান। প্রথমত তিনি আন্তর্জাতিকমহলকে এই বার্তা দিলেন যে বাংলাদেশের তদারকি সরকার সংবিধানকে গ্রাহ্য করে না। করলে গত দেড় বছরে বঙ্গভবনে ইউনূসের পদধুলি পড়ত। দেশের শাসনক্ষমতা হাতে নেওয়ার পর একজন ১৪ বার বনবাস গিয়েছিলেন। মানে ১৪ বার দেশান্তরী হয়েছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতির মতো একজন সাংবিধানিক প্রধানের সঙ্গে দেখা করার সৌজন্যটুকু ইউনূস সাহেব দেখাতে পারেননি।
দ্বিতীয় বার্তা, আওয়ামী লীগের মতো একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলকে নির্বাচন প্রক্রিয়ার বাইরে রাখাকে তিনি সমর্থন করেন না। রাষ্ট্রপিত চুপ্পু কিন্তু অনেকদিন আগেই জানিয়েছিলেন, শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র তাঁর কাছে নেই। এই বিবৃতি গত বছর ১৯ অক্টোবরের। তার মানে তদারকি সরকারকে তিনি ঘুরিয়ে বুঝিয়ে দিলেন যে এটা অবৈধ সরকার। তারপরেও ইউনূসের সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। সেটা না করে তিনি একের পর এক অসাংবিধানিক কাজ করে গিয়েছেন। সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি হল ইউনূস সাহেব শাসন ক্ষমতার পরিকাঠামোর ওপর স্টিম রোলার চালিয়ে এসেছেন। আর তাই, ভোট নির্ঘণ্ট ঘোষণার দিন ইউনূসের পরনে থাকা কৌপিনটুকু কেড়ে নিয়ে তাঁকে ‘উলঙ্গ রাজা’ করে দিলেন সাহাবুদ্দিন চুপ্পু।
আবার বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছে ডিপ স্টেট। জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী পর্যায়ে হাসিনা সরকারের পতনের পর এসেছিল ডিপ স্টেটের...
Read more












Discussion about this post