গোপালগঞ্জের ঘটনা নিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া দিল ভারতের বিদেশমন্ত্রক। পাশাপাশি ঢাকাকে ভারত-বাংলাদেশের বহুস্তরীয় সম্পর্কের কথা আরও একবার স্মরণ করিয়ে দিল নয়া দিল্লি। কূটনৈতিক মহলের মতে, গোপালগঞ্জের হিংসা নিয়ে ভারতের বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল খুবই সংক্ষিপ্ত বার্তা দিয়েছেন, কিন্তু সময়ের নিরীখে তা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। অন্যদিকে বাংলাদেশের সেনাপ্রধানও এদিন প্রকাশ্য এক অনুষ্ঠানে ভাষণ দিলেন, কিন্তু তাঁর মুখে গোপালগঞ্জের প্রসঙ্গ আসেনি। এমনকি বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টাও গোপালগঞ্জ নিয়ে মুখ খোলেননি, বা দুঃখপ্রকাশ করেননি। তবে জানা যাচ্ছে, মুজিব-হাসিনা আবেগ দমনে এবার বাংলাদেশে ‘গোপালগঞ্জ’ জেলাটাই বিলোপের ভাবনা-চিন্তা শুরু করেছে ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
ঢাকা ডিভিশনের অন্তর্গত গোপালগঞ্জ হল বাংলাদেশের একটি জেলা। আর গোপালগঞ্জের একটি উপজেলা হল টুঙ্গিপাড়া। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের জন্মস্থান হওয়ায় বাংলাদেশের অস্তিত্বের সঙ্গে জুড়ে আছে এই জেলা ও উপজেলার নাম। টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর পৈতৃক ভিটে, সেখানেই তাঁর সমাধি। অন্যদিকে টুঙ্গিপাড়া আবার শেখ হাসিনারও জন্মস্থান। তাই সচেতনভাবেই এনসিপি নেতারা গোপালগঞ্জে “জুলাই পদযাত্রা” কর্মসূচিকে ঘুরিয়ে দিয়ে মার্চ ফর গোপালগঞ্জ নাম দিয়েছিল। জানা যাচ্ছে, এনসিপি নেতাদের কেউ কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায় বঙ্গবন্ধুর মাজার ভাঙার ডাক দিয়ে বসেছিলেন। যা নিয়ে গোপালগঞ্জবাসী ক্ষেপে যান। মূল অশান্তির সুত্রপাত এখানেই। কিন্তু সেনাবাহিনী কেন গুলি চালালো গোপালগঞ্জে? যার জবাব স্পষ্ট করে দেয়নি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। তবে বাংলাদেশ সেনার আইএসপিআর যে বিবৃতি দিয়েছে তাতে আওয়ামী লীগ সমর্থক এবং গোপালগঞ্জবাসীদের একটা অংশকে সরাসরি সন্ত্রাসী বলা হয়েছে। যে হেতু ওই বিবৃতি জারি করেছে সেনাবাহিনীর আন্তঃ জনসংযোগ পরিদফতর, তাই ধরেই নেওয়া যায় তাতে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের সম্মতি ছিল। শনিবার একটি অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান ভাষণ দিয়েছেন, তাতে তিনি বলেন, মানবিক ও ভালো মানুষ না হলে দেশের উন্নতি সম্ভব না। মিরপুর সেনানিবাসে মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির তৃতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সমাপ্তি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখতে গিয়ে এই মন্তব্য করেন সেনাপ্রধান।
আশ্চর্যের বিষয় হল, গোপালগঞ্জে নিরীহ এবং নিরস্ত্র স্থানীয় বাসিন্দা এবং আওয়ামী লীগ সমর্থকদের উপর নির্বিচারে গুলি চালানোর যে অভিযোগ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে উঠেছে, তা নিয়ে কোনও সাফাইও দিলেন না সেনাপ্রধান। এটা রাজনৈতিক মহলকে ভাবাচ্ছে। সর্বভারতীয় কয়েকটি সংবাদমাধ্যম দাবি করছে, গোপালগঞ্জের ঘটনা নিয়ে প্রবল চাপে পড়েছেন সেনাপ্রধান। তিনি ঘটনার পরই ভারতের সেনাপ্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাঁকে সময় দেননি ভারতের সেনাপ্রধান। এমনকি বাংলাদেশের তরফেও নয়া দিল্লির সঙ্গে যোগাযোগ করে এই ঘটনা নিয়ে কিছু বার্তা দেওয়ার চেষ্টা হয়। কিন্তু দিল্লি তাতে আমল দেয়নি। কিন্তু গোপালগঞ্জের ঘটনা নিয়ে ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্রকে প্রশ্ন করা হলে তিনি খুব সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া দেন। ওই প্রশ্নের উত্তরে বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, আমরা আমাদের অঞ্চলের সব ঘটনাপ্রবাহ ঘনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করি এবং যা ঘটছে তা বিবেচনায় নেওয়া হয়। প্রয়োজনে আমাদের পক্ষ থেকে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহন করা হবে।
রণধীর জয়সওয়ালের শেষের লাইনটিকে যথেষ্টই গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন কূটনৈতিক মহলের একাংশ। ইতিমধ্যেই চর্চা শুরু হয়েছে, ভারত কি ব্যবস্থা নিতে পারে বাংলাদেশে! যদিও বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে অন্য একটি প্রশ্নের উত্তরে বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র জানিয়েছেন, বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার। আমরা বারবার বলেছি, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আমরা এমন নির্বাচনকে স্বাগত জানাই; যা গণতান্ত্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সকল পক্ষকে এতে অন্তর্ভুক্ত করে। অর্থাৎ, ভারত যে আওয়ামী লীগকে নিয়েই বাংলাদেশে নির্বাচন চাইছে, আরও একবার স্মরণ করিয়ে দিল বিদেশ মন্ত্রক। কিন্তু বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কি ভারতের প্রস্তাবকে গুরুত্ব দিচ্ছে? বিশেষজ্ঞমহল মনে করছে, এর উত্তর হল-“না”। জানা যাচ্ছে, জামাত-বিএনপি-এনসিপির দাবি গোপালগঞ্জ জেলাকেই বিলুপ্ত করার। অর্থাৎ গোপালগঞ্জ আর জেলা হিসেবে চিহ্নিত যাতে না হয়, তার ব্যবস্থা করার দাবি উঠেছে। এবং ইউনূস সরকার সেই দাবি মেনে কাজও শুরু করেছে। কিন্তু রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের মতে এটা হাস্যকর প্রচেষ্টা। কারণ, কাগজে কলমে নাম, অস্তিত্ব বদল করা হলেও মানুষের মন থেকে বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলা যাবে না।যেমন সরকারিভাবে নিষিদ্ধ ছাত্র লিগ গোপালগঞ্জে সরকারপক্ষকেই রুখে দিয়েছে। এনসিপি ছাত্রনেতাদের প্রাণ হাতে করে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া গাড়িতে ঢুকে পালাতে হয়েছিল।











Discussion about this post