হাসিনা নেই। গত এক বছরের বেশি সময় ধরে তিনি দিল্লির আশ্রয়ে রয়েছেন। কবে তিনি দেশে ফিরবেন, সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোনও ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে নির্বাচন। সেই নির্বাচন কতটা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে, তা নিয়ে কিন্তু এখন থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। আগামী লীগ সুপ্রিমো হাসিনা তাঁর কর্মী সমর্থকদের পরামর্শ দিয়েছেন ১২ ফেব্রুয়ারি বুথ বয়কটের। এদিকে আবার বুধবার সে দেশের একটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, তারেক রহমানের বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসীন হতে চলেছেন। পরিস্থিতি এককথা জগাখিচুড়ি। আগামীদিনে বাংলাদেশ কে শাসন করবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিকমহলও জল মাপতে পারছে না।
পদ্মাপারের পরিস্থিতি যখন এইরকম সেই সময় এল আরও ভয়ঙ্কর খবর। সেই খবর জল নিয়ে হাসিনার আমলে হওয়া তিস্তা জলবন্টন চুক্তির কী হবে? হাসিনাহীন বাংলাদেশে কি জলের জন্য হাহাকার শুরু হবে। চুক্তি পুনর্নবীকরণ না হলে তো সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তি, যা ফরাক্কা চুক্তি নামে পরিচিত, তার নবায়ন আপাতত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আগামী ডিসেম্বরে এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে নবায়নের কোনো আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়নি। ফলে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে চুক্তিটি নবায়নের সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে।
এই চুক্তি হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। ওই বছর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হরদাহানলি ডোড্ডেগৌড়া দেবে গৌড়া (এইচ ডি দেবে গৌড়া) এবং বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হাসিনার মধ্যে এই চুক্তি দিল্লিতে সই হয়। এই চুক্তির দৌলতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৯৫ হাজার কিউসেক জল পেয়ে থাকে বাংলাদেশ। কিন্তু এই চুক্তি সইয়ের সময় একটা বিষয় তখনই স্পষ্ট হয়ে যায় যে এটা ছিল মেয়াদি চুক্তি, যার মেয়াদ ৩০ বছর। ফলে, এই চুক্তি যে কোনওদিন অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে, সেটা চুক্তি সইয়ের বছরেই নিশ্চিত হয়ে যায়। ঘটনাচক্রে পদ্মাপারের রাজনীতি বদলে গিয়েছে। হাসিনা ক্ষমতায় নেই। তিনি আদৌ ক্ষমতায় আসতে পারবেন কি না সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। এলেও কীভাবে আসবেন, তা নিয়ে কম জল্পনা চলছে না। এই অবস্থায় তিস্তা জলবন্টন চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে বড়ো ধরনের প্রশ্ন উঠে গেল। আর এই জলবন্টন চুক্তি মেয়াদি হলে, সেটা একসময় রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
এই অবস্থায় গঙ্গার জলবণ্টন চুক্তি পর্যালোচনা এবং বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) ৮৬তম বৈঠকে যোগ দিতে গত সোমবার (৩ মার্চ) কলকাতায় পৌঁছায় বাংলাদেশের সাত সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। হাওড়া থেকে ট্রেনে চড়ে তারা পৌঁছান মুর্শিদাবাদ জেলার ফরাক্কায়। বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে ছিলেন ভারতের নদী কমিশনের সদস্যরাও। পরে তারা যৌথভাবে ফরাক্কা পরিদর্শন করেন। মঙ্গলবার (৪ মার্চ) ফারাক্কা পরিদর্শন করে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের প্রধান মোহাম্মদ আবুল হোসেন জানিয়েছেন, সম্প্রতি ফরাক্কায় নাব্য কমে গেছে। গত জানুয়ারি মাসে ঠিক ছিল, কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে কিছুটা কমে গেছে। কূটনৈতিক ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ধারণা, আসন্ন ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দায়িত্ব গ্রহণকারী নতুন সরকারই গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি নবায়ন বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। নির্বাচন সামনে রেখে সংবেদনশীল এই ইস্যুতে বড় কোনো রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে সরকার আগ্রহী নয় বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত-বাংলাদেশের জলবন্টন চুক্তি এখন আর কেবল কারিগরি বা পরিবেশগত বিষয় নয়; এটি দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক, আঞ্চলিক কৌশল এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। বর্তমান সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের টানাপড়েন, পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি এবং হাতে থাকা সীমিত সময় ফারাক্কা চুক্তি নবায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই জল ও সীমান্ত ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। তিস্তা, ফেনি, মুহুরীসহ অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত নদীর মতো গঙ্গার পানিবণ্টনও রাজনৈতিক সমাধানের অপেক্ষায় রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলে রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে—এ কারণেই সরকার সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। শেষবার যখন হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ভারতে এসেছিলেন সেই সময় তাঁকে এই চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, চুক্তির নবায়ন না হলেও এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের যে পরিমাণ জল পাওয়ার কথা, তারা সেটা পাবে।












Discussion about this post