২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশ থেকে অপসারণের পর ভারত তাঁকে আশ্রয় দিয়েছে। কেবলমাত্র রাজনৈতিক আশ্রয় নয়, বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীকে রীতিমতো রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় রাখা হয়েছে ভারতে। আজ পর্যন্ত তাঁর অবস্থান জানানো হয়নি, কাউকে জানতেও দেওয়া হয়নি। এতটাই গোপনীয় স্থানে তাঁকে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এবং তাঁদের অংশীদারদের এখন একটাই লক্ষ্য, শেখ হাসিনা এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশ থেকে নির্মূল করা। এর জন্য যা যা করা সম্ভব, তাইই করে চলেছে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। বাংলাদেশে তাঁকে বিচারের মুখোমুখি করে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থাও করেছে, অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে শেখ হাসিনাকে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার তাঁকে হাতে পাচ্ছে না, কারণ তিনি ভারতের নিরাপদ আশ্রয়ে। এখান থেকেই ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হওয়ার শুরু, আর এখানেই কার্যত মুখ থুবড়ে পরেছে। সম্প্রতি ভারতের লোকসভার সাংসদ শশী থারুরের সভাপতিত্বে বিদেশ বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তাতে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী ভারতের জন্য এখন “সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ”। সেই চ্যালেঞ্জ ভারত কিভাবে অতিক্রম করবে সেটা নিয়েও কিছু পরামর্শ দিয়েছে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।
বাংলাদেশ এখন ভারতকে রীতিমতো চোখ রাঙাচ্ছে। তাঁদের ভাষায় চোখে চোখ রেখে কথা বলছে ভারতের সাথে। তবে আশ্চর্যজনকভাবে ভারত অসম্ভব নিরবতা পালন করছে। মোদি সরকার এখনও পর্যন্ত সেরকম কোনও কড়া পদক্ষেপ নেয়নি, এমনকি কড়া বার্তাও দেয়নি বাংলাদেশকে। বিগত কয়েকমাসে ভারত কয়েকটি বিবৃতি দিয়েছে, তবে সেটা নিতান্তই কূটনৈতিক ভাষায়। এখানেই প্রশ্ন উঠছে, ভারত কি তাহলে বাংলাদেশকে নিয়ে বিভ্রান্ত? তবে কূটনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছেন, নরেন্দ্র মোদি সরকার একটা বড় সামরিক চাপ তৈরি করেছে বাংলাদেশের উপর। তাঁরা যতই হুমকি, ধমকি দিক, যতই সেভেন সিস্টার্স, চিকেন নেক দখলের হুঁশিয়ারি দিক ভারত নিঃশব্দে কেবল বাংলাদেশ সীমান্তে নিজেদের সামরিক তৎপরতা বাড়িয়েছে। নতুন নতুন সেনাছাউনি বাড়িয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের সঙ্গে স্থল বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ করেছে। যদিও বাংলাদেশের অনুরোধে ভারত চাল, পিঁয়াজের মতো নিত্যপ্রয়জনীয় পণ্য রফতানি করছে, কিন্তু আমদানি কার্যত পুরোপুরি বন্ধ। এই ধাক্কা কিন্তু বাংলাদেশি রফতানিকারকদের, যার দায় নিতে হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারকে। ভারত ভিসা সীমিত করায় প্রবল সমস্যায় পড়েছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ, পড়ুয়া ও ব্যবসায়ীরা। এর দায় বর্তাচ্ছে ইউনূস সরকারের উপর। যদিও সম্প্রতি বাংলাদেশও ভারতে থাকা ভিসা সেন্টার বন্ধ করে দিয়েছে, তাতে কূটনৈতিক বার্তা দেওয়া হলেও ভারতের খুব একটা ক্ষতি হবে বলে মনে করছেন না ওয়াকিবহাল মহল। এখন প্রশ্ন হচ্ছে ভারত কি বড় কোনও পদক্ষেপ নিচ্ছে?
সম্প্রতি বাংলাদেশে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার গ্রিগোরিয়েভিচ খোজিন একটা বড় বার্তা দিয়েছেন মুহাম্মদ ইউনূস সরকারকে। তিনি ভারতের পাশে দাঁড়িয়েই বাংলাদেশকে উত্তেজনা কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন। রুশ রাষ্ট্রদূত বলেন, আমরা বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট মন্তব্য করতে চাই না। তবে পরিস্থিতিটি আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। কারণ, এটি শুধু দুই দেশের জন্য নয় বরং পুরো দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি ভূরাজনৈতিক বিষয়, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে যদি ফলপ্রসূ সমাধান না আসে। অর্থাৎ, ভূরাজনৈতিক বিষয় উল্লেখ করে তিনি ভারতের বড় কোনও পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়ে বসেন। অন্যদিকে, আমরা দেখলাম, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সাংসদরা মুহাম্মদ ইউনূসকে বড় বড় চিঠি দিচ্ছেন সংযত থাকার বার্তা দিয়ে। আবার আসন্ন নির্বাচন নিয়েও নানা পরামর্শ দিচ্ছেন মার্কিন সাংসদ সদস্যরা। এর পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে, জাতিসংঘও কিছুটা পিছু হঠে মুহাম্মদ ইউনূসকে দ্রুত শান্তি ফেরানোর কথা বলছে। সবমিলিয়ে আন্তর্জাতিক মহল থেকে চাপ বাড়াচ্ছে ভারত। সেই সঙ্গে সামরিক তৎপরতা বজায় রেখে বাংলাদেশ সেনাকেও চাপে রাখছে ভারত। ফলে অনেকটাই সুর নরম করতে বাধ্য হয়েছে ইউনূস সরকার। এখন দেখার, তুরস্ক ও পাকিস্তানের উস্কানি মুহাম্মদ ইউনূসকে কতটা প্রভাবিত করে।












Discussion about this post