১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। যা আর হাতে গোনা কয়েকটা ঘন্টার অপেক্ষা।শুধু একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়াই নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র নেতৃত্বাধীন ব্যাপক আন্দোলনের জেরে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদচ্যুতির পর এটাই প্রথম বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন।ফলে এই ভোটের ফলাফল শুধু ঢাকার ক্ষমতার সমীকরণই বদলাবে না, নয়াদিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের ভবিষ্যৎ পথচলাও নির্ধারণ করতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুই দেশের সম্পর্ক কিছুটা শীতল ছিল। তাই প্রশ্ন উঠছে এই নির্বাচন কি আবার সেই পূর্বের মতো ‘সোনালি যুগে’ ফিরিয়ে নেবে দুই প্রতিবেশী দেশকে, নাকি সম্পর্ক আরও বেশি বাস্তববাদী ও লেনদেন নির্ভর হয়ে উঠবে দু’দেশের সম্পর্ক?
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৪,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ সীমান্ত। পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্যের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য ঢাকা নয়াদিল্লির সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট ভারতের জন্যও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখন সবার নজর কে গড়বে পরবর্তী সরকার? কোনো কট্টরপন্থী শক্তি কি ক্ষমতায় আসবে? পাশাপাশি তার প্রভাবই বা কতটা পড়বে ভারতের উপর?
বর্তমানে বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি যা বিএনপি নামে পরিচিত, সেই দল তারেক রহমানের নেতৃত্বে, নির্বাচনে এগিয়ে রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। অতীতে ভারতের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকলেও, এখন তারা ‘বাংলাদেশ সবার আগে’ নীতি তুলে ধরছে। তাদের স্লোগান ‘বন্ধু হ্যাঁ, প্রভু নয়’ ইঙ্গিত দিচ্ছে সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক পুনর্নির্মাণের দিকে।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থানও নজর কাড়ছে। কট্টরপন্থী ভাবধারার জন্য পরিচিত এই দলটি যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা বাস্তববাদী অবস্থান নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে, তবুও তাদের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে নয়াদিল্লির উদ্বেগ রয়েই গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত এবার এককভাবে আওয়ামী লীগের ওপর নির্ভর করার কৌশল থেকে সরে এসে বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। লক্ষ্য ভবিষ্যতের রাজনৈতিক পরিবর্তনেও সম্পর্ক যেন অটুট থাকে।নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও কূটনীতি এই তিন ক্ষেত্রেই ভোটের প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশ যদি চিন ও পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ায়, তবে তা ভারতের কৌশলগত স্বার্থে প্রভাব ফেলতে পারে। ইতিমধ্যেই চিন প্রতিরক্ষা চুক্তি ও অবকাঠামো প্রকল্প যেমন পদ্মা সেতুর মাধ্যমে বাংলাদেশের উপর প্রভাব বিস্তার করেছে।এছাড়া, শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টিও বড় কূটনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। নতুন সরকার যদি তাঁর প্রত্যর্পণ দাবি করে, তবে তা নয়াদিল্লির জন্য এক কঠিন পরীক্ষার মুহূর্ত হতে পারে।সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়েও ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আলোচনা জোরদার হয়েছে। পরবর্তী সরকার এই বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়, তা দুই দেশের পারস্পরিক আস্থার অন্যতম মাপকাঠি হয়ে উঠবে।পাশাপাশি দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত তিস্তা জলবণ্টন চুক্তি ও বাণিজ্য ঘাটতির প্রশ্নও আবার আলোচনার কেন্দ্রে আসতে পারে। ঢাকা ইতিমধ্যেই ‘ন্যায্য ও সমতার ভিত্তিতে’ সম্পর্কের কথা বলছে, যা আগের ধারণকৃত আধিপত্যবাদী কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত দেয়।ভারত চাইছে একটি স্থিতিশীল ও দায়িত্বশীল সরকার, যাতে সীমান্তে অনুপ্রবেশ রোধ করা যায় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা বজায় থাকে। ইতিহাস বলছে, বাংলাদেশ একাধিক রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। আবারও এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে দেশটি।
এমন পরিস্থিতিতে ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সতর্ক ও কৌশলী থাকা। কারণ কূটনীতির জগতে কথার চেয়ে কার্যত পদক্ষেপই শেষ কথা বলে। ১২ ফেব্রুয়ারির ফলাফল তাই শুধু একটি দেশের সরকার গঠনের প্রশ্ন নয়, বরং দুই প্রতিবেশীর ভবিষ্যৎ সম্পর্কের রূপরেখা নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
এখন দেখার বিষয় আর কয়েকটা দিন পরেই অর্থাৎ ১২ ফেব্রুয়ারির পরে ভারত বাংলাদেশের সম্পর্ক সে দেশের গলিতে বসা দলটি কিভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়।












Discussion about this post